Author

Papia Bhattacharya ।। পাপিয়া ভট্টাচার্য

papia heontor

বন্ধু, রহো রহো সাথে...

পাপিয়া ভট্টাচার্য

   মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে এরকম স্থবির একটা সময়ের ভেতর আছি।
দিন মাস সব গুলিয়ে গেছে, ঝিমিয়ে কাটছে সময়। রোজ ভাবি, আজ যেন কী বার!  কত তারিখ! কিছুতেই মনে আসে না  সহজে। তার মধ্যে এই একটা সপ্তাহ  যেন  একদম অন্যরকম। সেই কোন কাল থেকে শুরু হওয়া বিশেষ এই সময়টা সব অবস্থাতেই কী করে যে একই রকম সুরে বাঁধা হয়ে আসে কে জানে!  উদবেগের মধ্যেও কেমন প্রসন্ন আর শান্ত হয় মন, যখনই তাঁকে ভাবি। এ জীবনে আর কাউকেই পেলাম না এমন করে আঁকড়ে ধরার। 
   কদিন ধরে  কানের কাছে   ' কার যেন এই মনের বেদন' ...গুনগুন করে যাচ্ছে কেউ! কার বেদন আর  হবে !  আমারই ,আমাদেরই!  দিনগুলো সব এখন এই বেদন দিয়ে মাখামাখি। তারপরও ওই বিষণ্ণ  লাইনগুলোই কেমন  ম্যাজিকের মতো কাজ করে ভেতরে, চোখে জল আসে, ক্যাথারসিস হয়।  যত দিন যায়, ততই বেশি করে বুঝি,  মোটের ওপর কোন অবস্থাতেই তাঁকে ছাড়া চলবে না আমার , সমস্ত অনুভূতির পরতে পরতে শুধু  তিনি তিনি তিনি।
  এ বছরটা আমাদের  আজন্ম দেখে আসা দিনগুলো থেকে ভয়ংকর রকমের আলাদা, মহাসংকট কাল। এবার কোভিড সাহেব তাণ্ডব নৃত্যে মেতেছেন। ...  তোমার বিশ্ব নাচের দোলায়, বাঁধন পরায় বাঁধন খোলায়...  পুরো বিশ্বটাকে কেউ যেন  প্রবল  ঝাঁকুনি দিয়ে কঠিন বাঁধনে বেঁধে রেখেছে । এ বজ্রমুষ্টি  থেকে কবে মুক্তি  মিলবে কে জানে!  এর মধ্যেও এক একটা দিন ফুরোয়, আরো বেশি করে আশ্রয় খুঁজি তাঁর কাছে।
সুরে স্বরে যেভাবেই শুনি না কেন ...সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে শোন শোন পিতা, কহো কানে কানে শোনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা।.... বেশ শক্তি আসে মনে, থমথমে পরিবেশে শুভ কিছু ছড়িয়ে যায়। বিশ্বাস হয়, মঙ্গগলবারতা আসবে, আসবেই।
     তাঁর  যে কোন গানের অনুষঙ্গেই দেখি টুকটুক  করে এক একটা স্মৃতির পর্দা  খুলে যায়।  যাঁরা আছেন, যাঁরা ছিলেন, সব মনে পড়ে।  এই মনে পড়ানোর আর এক নাম পঁচিশে বৈশাখ ।
  পঁচিশে বৈশাখ  তাই শুধু রবীন্দ্রনাথের নয়,  প্রতিবার নতুন করে এই দিনটাতে আমারও জন্ম হয় যেন।  সারা বছর তিনি যতই আমাদের যাপনে জড়িয়ে থাকুন, এই  দিনটা কিন্তু বিশেষ রকমে বিশেষ, আমার কাছে। ও যতই পুজার ছলে তাঁকে ভুলে থাকার কথা বলা হোক, যতই দিনটাকে ঘিরে হুজুগের কথা বলা হোক, পঁচিশে বৈশাখ  নিয়ে আমার কিন্তু বাপু বেশ একটু 'আদিখ্যেতা' আছে। তাঁর আসা তো আসা নয়, আবির্ভাব। দিনটাকে একটু বাড়তি আদর  যত্ন করতে হবে না!
       সব শুরুরও আগে যে একটা শুরু থাকে, আমার সেই শুরুর দিনগুলি এসময় ভোর ভোর হাজির হয়ে যায়  গীতার পিসিকে সঙ্গে নিয়ে। আমাদের গৃহসহায়িকা সেই বালবিধবা পিসি,  যে তার ভাইঝির নামেই বেঁচে রইল মৃত্যুর পরও , সামান্য সেই মানুষটাও উঠে আসে দিনটার হাত ধরে।
  প্রতি পঁচিশে বৈশাখের সকালে আমাদের চাতালে মায়েদের শাড়ি দিয়ে সাজানো,  ক্যালেন্ডার থেকে  কাটা কিছুটা রবীন্দ্রনাথের মতো দেখতে ছবিটি ঘিরে ভুলভাল উচ্চারণে, খুঁতো সুরে আবৃত্তি, গান আর নাচের জমজমাট  হইচই শেষ হলে  মায়ের এক ঝুড়ি লুচি বেলায় সাহায্য করতে করতে পিসি গজগজ করত, ' গড় করি মা তোমাদের ফানশানকে! আর কারো যেন  জম্মোদিন হয় নি সোমসারে,  বউদিদি আর আমি খেটে খেটে মরে গেলুম গো। '
রাগের কারণ ছিল পিসির, ওই অতগুলি বাচ্চার জন্যে অনেক লুচিই বেলতে হত তাকে। কিন্তু দিনটা যে খুব স্পেশাল, সে বোধের হাতেখড়ি তো ওই বয়স থেকেই, ফলে পিসির ওই ' ফানশান' দিন দিন আরো একটু পরিণত হয়ে সারাজীবনের জন্যে সঙ্গে রয়ে গেল।
   তাই পঁচিশে বৈশাখ এলে পিসির সেই হুতাশ আমার মনে পড়বেই৷ আর  রবীন্দ্রনাথের মতো  খানিকটা দেখতে সেই  ক্যালেন্ডারের ছবিটার কথাও, যাঁর মুখে আমি স্পষ্ট দেখেছি  মিটিমিটি হাসি, রসিক কবি নিশ্চয়ই  আমাদের বালখিল্যপনাতেও বেশ মজা পেতেন।
   একসময়  সব সৃষ্টি  ছাপিয়ে আমাকে জড়িয়ে রইল তাঁর  গান। গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত শীত বসন্ত... আহ, সব ঋতু ভরে ওই একজনই, মরণ হতে জাগিয়ে তোলার জন্যে। জানি, এ জীবনে যত বিচ্ছেদ এসেছে, আরো যত আসবে , সব সয়ে নিতে আমার ধ্রুবতারার  সঙ্গে এই নিবিড় যোগাযোগ আর ফুরোবে না৷ আর আমারে বাইরে তোমার কোথাও যেন না যায় দেখা...।
    সময়ের নিয়মে দিনগুলো তো আর এক থাকে না।  পরিবর্তনের হাওয়ায় হাওয়ায় এক একসময় এক এক রূপ হয়েছে তার। শ্বশুরবাড়িতে আসার সময় বাবা মার বিয়েতে পাওয়া সঞ্চয়িতা আর এক খণ্ড গীতবিতান নিয়ে এসেছিলাম,  আমার চিরদিনের একমাত্র সঙ্গী৷ সেই ভিন্ন পরিবেশে আর এক পঁচিশে এল,  আমার আর্জি মঞ্জুর করে শ্বশুরবাড়িতে প্রথম শুরু হল রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। শুধু আমার স্নেহময় শ্বশুরমশাই হেসে হেসে বলেছিলেন, আরে আমরা তো এতদিন জানতাম এসব স্কুলে কলেজেই পালন করে। বাড়িতে করতে তোমরা?   তা বেশ, করো না!
    কী এমন করতাম!  ছেলেবেলার ধুলোখেলা সাঙ্গ হলে প্রিয় দিনটি নিয়ে  বিশেষ কী আর করে মানুষ!  শুধু দিন পরে যায় দিন, উচ্ছ্বাস কমে, আরো আরো শান্ত গভীরে প্রবেশ করেন তিনি। তখন  তত্ব তথ্যের গুরুভার কিছু নয়, কোন ভারি কথা নয়,  শুধু অনুভব আর  ভালবাসা,  প্রিয় কিছু গান, আর শুধু সমর্পণ... সুধা তোমাকে ভোলে নি!
  এমনি করে এখনও এই দিনটার ভেতর কত প্রিয় মানুষ হারিয়ে গিয়েও  এসে দাঁড়ান। মনে হয়,  এই পঁচিশেও প্রিয় কবি অধ্যাপক  অনুত্তম বিশ্বাস ঠিক  তাঁর  উদাত্ত খোলা গলায়  গেয়ে উঠবেন , এ পরবাসে রবে কে! যে গান শুনে আমার ঘরের লাল মেঝের ওপর সাদা আল্পনায় বসা জন্মদিনের স্বল্প সাজের কবি আলো আলো হয়ে উঠতেন।  তাঁর এপারের পরবাস পর্ব শেষ হয়ে গেছে অল্পদিন আগেই , কিন্তু আর এক পরবাসেও তো অপেক্ষা আছে কতজনের। কে আর যায় কোথায় ! এঘর, ওঘর বই তো নয়!
   তারপর যা হয়, একদিন বাইরের এটুকু হইচইও থেমে গেল। শাশুড়িমা নেই,  ছেলে চলে গেল বাইরে, বাড়ি শূন্য। আবার আমি একা, মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ। আর সারাদিন শুধু  ঘুরে ঘুরে বিক্রম সিং খাংগুরার কণ্ঠের মগ্ন নিবেদন,  কবির প্রসন্ন মুখ৷
  আর এবার তো আমি সবকিছু থেকে, সমস্ত দিক থেকেই অনেক দূরে,  ...নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা।

Write comment (0 Comments)

প্রবাসীর ডায়েরি
পাপিয়া ভট্টাচার্য

আজ এপ্রিলের চোদ্দ তারিখ । আমাদের অনেক আদরের বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। সকালেই জেনে গেছি লক ডাউন আরো উনিশ দিন বাড়ছে। জানি এটাই হয়তো প্রয়োজন এখন , তবু নিজের বাড়ি ছেড়ে যে অনেক দূরে থাকে তার পক্ষে এই বন্দী দশার মেয়াদ আরো দীর্ঘ হচ্ছে , মেনে নেওয়া কঠিন । আমার কি বাড়ি ফেরা হবে না ? বাড়ি ফেরা কি হবে না আমার ! অবশ্য ভিন রাজ্যে আছি যখন, ফেরাটা সামনের দিনগুলোতেও মসৃণ হবে না জানি। এমনকি উড়ান যদি চালুও হয়, আর আমি মরিয়ার মতো মে মাসের শুরুতেও ফেরার চেষ্টা করি, তখনও সম্ভবত আমার ঠাঁই হবে রাজারহাট কোয়ারেন্টাইনে, সেই রকমই বলছে লোকজন। যখন এসব কল্পনা করি, আমার পুত্রটি হাসে, তোমার চিকিৎসারই তো বাকি অনেক। তা বটে, একটা ভাইরাস তো সব হিসেব গুলিয়ে রেখেছে।

ভাবা যায়! মাত্র কিছুদিনের মধ্যে সবকিছু এত ওলট পালট হয়ে গেল! এই তো জানুয়ারির শেষে না কি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে , মনে নেই ঠিক , যখন ইতিউতি শুনছি কি এক মারণঘাতী ভাইরাসে প্রচুর মৃত্যু ঘটছে , সেসময় আমি নিজেও আর এক ভাইরাসের আক্রমণে দিশেহারা । তাছাড়া যদিও মৃত্যু ব্যাপারটা খুবই মর্মান্তিক , কিন্তু সেসব হচ্ছে তো সেই উহানে। চীনারা সব যা তা খায় , হতে পারে তা থেকে, এখানে ওসব হবে টবে না । টুকটাক আলোচনা হয়, আবার সবারই এরকম আলতো গা ছাড়া একটা ভাবও । এমনকি ভার্চুয়াল জগতে যে সবকিছু নিয়েই একগাদা বিশেষজ্ঞ মতামত দিতেই থাকেন ক্রমাগত , তাদেরও খুব একটা হেলদোল দেখিনি সেসময়।

আর আমার নিজের মাথায় তখন আর অন্য কিছু ধরছে না , কিডনি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জেনে । যদিও গত দশ বছর ধরে এই আমার জীবন , শরীরের একটা অঙ্গ সারিয়ে তুলতে না তুলতে আর একটা চাকা বসে যায়।
তো এমন মোক্ষম মুহূর্তে কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাসের কথা হালকা ভাবে কানে আসছে, আর আমি দৌড়াদৌড়ি করছি নেফ্রোলজিষ্ট , এন্ড্রোকুইনোলজিষ্ট , গাদা টেস্ট এসব নিয়ে । তারপর আরো কিছু উন্নত চিকিৎসা, আরো বিশেষজ্ঞের পরামর্শের আশায় ব্যাঙ্গালোরে চলে আসা ।
জানি না আমি যে উড়ানে এসেছি , সেই উড়ানেই করোনাময়ী দেবী ( নাকি দেব! ) ল্যান্ড করেছিলেন কিনা ব্যাঙ্গালোরের মাটিতে ! তবে হাসপাতাল ডাক্তার ইত্যাদির প্রথম পর্বেই দেখলাম বেশ একটু সতর্ক আশঙ্কার ছায়া সবার মুখে চোখে । শুনলাম সেই চিনা ভাইরাস নাকি আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। ব্যাঙ্গালোরে বেশ কয়েকজন পজিটিভ এসেছে।

ঠিকঠাক গুরুত্ব না বুঝে আমরা মাতা পুত্র দু এক দিন মুখে হাতে কোন আড়াল না রেখেই ডাক্তার টেস্ট সব করেছি , তারপর মুখোশের ভেতর ঢুকে যেতে হল । চারদিকে তখন একটা আতঙ্কের ভাব , চারপাশে মুখোশের আড়ালে রোবটের মত মানুষজন । স্কুল কলেজ ঝটাপট বন্ধ হল, সব পরীক্ষা স্থগিত অনির্দিষ্টকালের জন্যে , অনেক অফিসই কর্মীদের হোম ওয়ার্ক শুরু করে দিয়েছে । শুধু আমার পুত্রের অফিসে সম্ভব নয় , তাকে তিনটে স্ক্রিনে একসঙ্গে কাজ করতে হয় । সে এই অবস্থায় আমাকে নিয়ে হাসপাতাল আর অফিসের মধ্যে ব্যালান্স করে ছোটাছুটি করে খুব ঝুঁকি নিয়েই । আর এসব নিয়ে চূড়ান্ত দুর্ভাবনার মধ্যেই আমাকে নতুন ট্রিটমেন্ট নিতে যেতে হয় হাসপাতালে , সেখানে বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের মতো নিজেদের নিশ্ছিদ্র আবরণের মধ্যে রেখে রক্ষীবাহিনী তৎপর, মুখোশধারী হতভাগ্য রুগীদের নানা রকম টেস্ট করে হাতে স্যানিটাইজার ঢেলে তবে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিত । তাদের মুখোমুখি দাঁড়াই , কেউ কারো মুখ দেখতে পাই না , শুধু চোখের তারা দুটি নড়েচড়ে তাদের , আমার অস্বস্তি হয় , মনে হয় প্রবল গা ছমছমে ভৌতিক একটা পরিবেশে, অন্য কোন গ্রহে দাঁড়িয়ে আছি । ব্যাঙ্গালোরে তখন করোনা রুগীর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমাগত । লাইনে দঁড়িয়ে কেউ হাঁচে কাশে, সবাই ছিটকে পরস্পরের থেকে দূরে যাবার চেষ্টা করে । করোনা রুগী ভর্তি আছে শুনে হাসপাতাল চত্বর খালি হতে হতে ওপিডি বন্ধ হয়ে যায়।

এর মধ্যে একদিন ধনলক্ষ্মী নামের তেলেগু মেয়েটি , আমাদের ফ্ল্যাটে যে গৃহকর্মে সহায়তা করে যায় , সে জানায় আঠারো নং টাওয়ার বন্ধ করে দিয়েছে , ওখানে নাকি কোন ভাইরাস রুগী আছে । সে ওখানেও কাজ করে , তাদের কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছে না ।
দুদিনের মধ্যেই আমাদের এই বিশাল আবাসনের প্রায় সব টাওয়ারেই গৃহ সহায়িকা দের আসা বন্ধ হয় । সেই দুদিনের আগেই আমরা আলোচনা করে ধনলক্ষ্মীকে সবেতন ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম। প্রতিদিনের সকাল সন্ধ্যে গমগম করা বিশাল আবাসন চত্বর, হঠাৎ শুনশান হয়ে গেল একদিনে। ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে যে কুচো কাঁচার হইচই ছোটাছুটি দেখে মন ভালো হত, ম্যাজিকের মতো উবে গেল তারা।
এখানে , এই ব্যাঙ্গালোরে যখন এসব চলছে , আমার নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে তখন ঝড়ের আগের শান্তি । তারপর এক সপ্তাহও কাটল না , আমলার ছেলে নামল কলকাতায় , ইউ কে থেকে তাকে আশ্রয় করে এল কোভিড ১৯ । বাকিটা ইতিহাস। সবার শিরদাঁড়ায় হিমশীতলতা ছড়িয়ে কেন, কোথায়, কিভাবে, কতজন সারাদিন এই নিয়ে ব্যস্ত মিডিয়া মরার আগেই আধমরা করে ফেলে মানুষকে। ক্রমশ শহর জেলা মহকুমা গ্রাম সব খান থেকে করোনা আক্রান্তের খবর আসে, মৃত্যুরও।

আমার টিভি দেখার অভ্যেস প্রায় নেই , শুধু ফেসবুকে বিশেষজ্ঞ দের মতামত পড়ি । দীর্ঘ সময় অসুস্থতার কারণে সব কিছুতে চরম উদাসীনতার পর করোনা আবার আমাকে ফেসবুক মুখী করে তোলে । আমার ঘুম এমনিতেই খুব কম , এখন প্রতি রাত প্রায় নির্ঘুম কাটে। যখন তখন ফেসবুকে উঁকি দিই , নতুন খবর খুঁজি, আশার খবর, পাই না। আমার নিজের দেশের স্বজন বন্ধুদের জন্যে উদ্বিগ্ন থাকার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে বার কয়েক যাবার সুবাদে প্রাপ্ত ডাচ আর ইতালির বন্ধু দের জন্যে বুক কাঁপে । ইতালির প্রায় শ্মশান হয়ে যাওয়া ছবি দেখে জর্জিয়া এলিসা , খুব প্রিয় ফুটফুটে দুই ইতালীয় কন্যার জন্যে কান্না পায় , নেদারল্যান্ডসে দুহাজার পাঁচশ জনের মৃত্যু খবর জেনে আমার প্রিয় ডাচ বন্ধু আস্ট্রিড, ওডেটের জন্যে বুক মুচড়ে ওঠে , ফেস বুকে খুঁজি ওদের, পাই না। এইভাবে অদৃশ্য মারণঘাতী একটা ভাইরাস আমাদের মধ্যে সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে কবে যেন একটা পরিবারের মতো করে তুলল আমাদের।

নতুন চিকিৎসা শুরু হবার পর সুস্থ হয়ে ওঠার আশা এই পর্যায়ের আগেই থমকে গেছে । বাড়ির বাইরে বেরোনো বন্ধ, ফলে চিকিৎসাও বন্ধ মাঝপথে । কর্ণাটকে , মহারাষ্ট্রে রোজ রোজ করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে শুনতে পাই । বেরোনোর উপায় নেই।

একুশ দিনের লক ডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আমার ছেলের অফিসেও ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু হয় । সে এখন বাড়িতে কাজ করে সারাদিন। ইউ কে থেকে সিনিয়র মিখাইলের সঙ্গে তার মিটিং হয় রোজ দুবার , প্রথাগত কাজের আলোচনার বাইরে শুনতে পাই লন্ডন আর ভারতবর্ষের সাম্প্রতিক অবস্থার কথাও বিনিময় হচ্ছে । গত গ্রীষ্মে লন্ডনে থাকাকালীন ক্যানরি হোয়ার্ফ নামের সুন্দর সাজানো শহরটিতে এইচ এস বি সির যে গ্লোবাল হেড কোয়ার্টারের সামনে রোজ বিকেল সাড়ে ছয়টায় গিয়ে দাঁড়াতাম আমি, ছেলের অফিস ছুটির অপেক্ষায়, আর ছেলে নেমে এলে যে রাস্তাটা দিয়ে দুজনে হেঁটে যেতাম টেমস নদীর পাড় ধরে , ওদের সিনিয়র মিখাইল আমাদের যে সুন্দর পথটা চিনিয়ে দিয়েছিল , অফিস পাড়ার যে রাস্তায় অজস্র মানুষের ভিড় থাকে সকাল থেকে রাত্রি অবধি, সব জনশূন্য। সমস্ত পাব রেস্তোরাঁ গুলোতে হাজার হাজার ব্যাংকার দের পার্টি চলত অফিস শেষে , ঝলমল করত চারদিক , সব নিস্তব্ধ এখন , কেউ কোথাও নেই । ল্যাপটপের স্ক্রিন জুড়ে মিখাইলের বিষণ্ণ মুখ ভেসে থাকে, চিনচিন করে বুকের ভেতর।

আমি একবার আমার নিজের মহকুমায় আক্রান্ত সিল করে দেওয়া গ্রামটির কথা জেনে মন খারাপ করে বসে থাকি, খোঁজ নিই বারবার, পরক্ষণেই খবর আসে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিউ ইয়র্কে অসুস্থ স্বজনদের, আবার কলকাতায় চোখ রেখে করোনা মৃতের শেষকৃত্যের ভয়ানক পরিণতি দেখি, এইভাবে দেশ বিদেশ সব একাকার হয়ে যায় এই ক্রান্তিকালে। করোনা সবাইকে যেন এক সূত্রে বেঁধেছে। এখন প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই , পুরো গ্রহটার সব মানুষ আতঙ্কের অন্ধকার ঘরে বন্দী করে ফেলেছে নিজেদের । ধনী দেশ গরীব দেশ , এসব আলাদা করে আর কিচ্ছু নেই , আমরা সবাই সেই তেনার করাল গ্রাসের শিকার । বরং ধনী দেশে আরো বেশি সংক্রামক , আরো মৃত্যু , হাহাকার আরো বেশি । এসময় দূষণ মুক্তির নীল আকাশ আর রাস্তায় হরিণের ঘুরে বেড়ানোর গল্পেও উৎসাহ পাই না। বরং রাগ হয়, পৃথিবীরও যে কিছু পরিচর্যা প্রয়োজন, এ কথা একবারও না ভেবে শুধু দূষণ বাড়িয়েই গেছি কেন! তাহলে তো আর নববর্ষের ঝলমলে দিনটা আজ এমন অন্ধকারে ডুবে যেত না।

বাইরের জগতের এই তোলপাড়ের মধ্যে বদ্ধ ঘরে ছোট ছোট সমস্যা মাথা চাড়া দেয়। ছেলের মুখ শুকনো, আমার প্রাণদায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জেকশনটি কোথাও মিলছে না এই লক ডাউনের চক্করে, অথচ একদিনও বন্ধ রাখার উপায় নেই, কি হবে! অবশেষে ভিডিও কনফারেন্সে ডাক্তার রুগীর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ আসে। ব্যবস্থা হয় টেস্টের, ইঞ্জেকশনের। ব্যাঙ্গালোর শহরটা নিজেকে খুব কঠিন শৃঙ্খলায় বেঁধে ফেলেছে, আশ্বস্ত লাগে এই সংকট কালে। নিজের রাজ্যের কিছু নির্বোধ মানুষজনের অপরিণামদর্শী কাজকর্মের জন্যে বিপদ বাড়ছে, ভেবে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা ভয়ের স্রোত নেমে যায়।

লক ডাউন বাড়ল, কতদিনের জন্যে কেউই জানি না ঠিক৷ তবে সবই তো মানুষের ভালোর জন্যে, আমাদের বিপদমুক্ত রাখতে। কিছু অশুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ তো এর প্রকৃত অর্থই বুঝতে পারছে না বা চাইছে না। তারা কোন সাবধানবাণীর তোয়াক্কা না করে বাইরে ঘুরছে, জটলা করছে এখানে ওখানে, এটাই মারাত্মক আশঙ্কার। বুঝছে না যে এইভাবে চলতে থাকলে এ ভাইরাস আরো মানুষজনকে খাবে, আমাদের গৃহবন্দীত্বের মেয়াদও বাড়তে থাকবে।
কলকাতার কিছু ডাক্তার বন্ধু আত্মীয়দের সঙ্গে কথা হয়, তাঁরা রাগ ক্ষোভ উগরে দেন। আক্রান্তের সংখ্যা কম দেখানোর জন্যে নাকি টেস্ট হচ্ছে না ভালো করে। অনেক তথ্য চেপে দেওয়া হচ্ছে।
এরকম হতে পারে সত্যি! নীরদ চৌধুরীর আত্মঘাতী বাঙালী কি এই মহাসংকটের সময়ও জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলতে পারে!
জানি না, কিন্তু মানুষের ধৈর্য এর বাঁধে ফাটল ধরার আওয়াজ পাই।

শব্দহীন জনমানবহীন একটা অপ্রাকৃত জগতে বসে থাকতে থাকতে হিম হয়ে আসছে শরীর! তারপরেও কোথাও একটু আশা ঝিলিক দিয়ে যায় মাঝে মাঝে। কাজ বন্ধ, রোজগার নেই, খেতে না পাওয়া গৃহবন্দী অসহায় মানুষের পাশে যখন কিছু মানুষ হাতটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন আশ্বাসের, হয়তো সে হাতের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কমই, সামনে আরো দুর্দিন অপেক্ষায় আছে, তবু এই আলোর হাত গুলো ভরসা জোগায়। খুব মানসিক যন্ত্রণায়, চরম উৎকন্ঠার মধ্যেও হাতগুলো ছুঁয়ে থাকি মনে মনে। প্রত্যাশা করি এর সঙ্গে আমাদের আরো কিছু হাত যোগ হোক, তারপর আরো কিছু, যে যার সাধ্যমতো। তাহলেই নিজেরা বেঁচে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদেরও বাঁচিয়ে তুলব , সবাই মিলে ঠিক পেরিয়ে যাব অন্ধকার।

একদিন প্রবাস থেকে ফিরে দেখব, আমার বাগানের গাছপালাগুলো আরো সবুজ হয়েছে। আদরের চাঁপা গাছটা অজস্র ফুল ফুটিয়ে একা একাই সেজে উঠেছে।
যারা এতকাল নিজের জন্য ছাড়া অন্য কিছু চেয়েও দেখিনি , তারাও ভাবব বড্ড ভুল হয়ে গেছে, এবার আরো বড় করে ভাবতে হবে। একটা ভাইরাস আমাদের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রেখে শিখিয়ে দিচ্ছে, আমরা এই বিশ্ব থেকে শুধু নিয়েছি, বিনিময়ে দিইনি কিছুই, ভাবিওনি যে এই গ্রহটা সুস্থ না থাকলে জাগতিক সব সঞ্চয় মূল্যহীন হয়ে যাবে। আমরা ভালো থাকতে চাইলে তারও কিছু শুশ্রূষার প্রয়োজন ৷ কি জানি, এই সময়কার গভীর অস্তিত্ব সংকট বাঁচিয়ে জীবনে ফিরতে পারলে এই শিক্ষা কাজে লাগাতে পারব কিনা!

মাঝরাতে আজ নেদারল্যান্ডস থেকে বহুদিন পরে মেসেজ এল আমার প্রিয় ডাচ বন্ধুটির। সেই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের দেশ তছনছ করেও অজস্র মৃত্যু, গৃহবন্দী মানুষজন। তবু শূন্যপুরী আলো করে টিউলিপ নিজের নিয়মে ফুটতে শুরু করেছে পর্যটক শূন্য বিজন অপরূপ আমস্টারডামে। কি ইউরোপ, কি ভারতবর্ষ , বিশ্বের কোনখানি প্রকৃতি তার দানে কোন কার্পণ্য রাখেনি এই নিদারুণ সময়েও। কোথাও পলাশ কৃষ্ণচূড়া, কোথাও টিউলিপ, আরো কত কি! প্রতি বছরের মত এবারও একগোছা টিউলিপের সঙ্গে আমার বিদেশী বন্ধুর, আমার বোনের আশাভরা শুভেচ্ছাবার্তা এক ঝলক ভালো লাগার বাতাস আনে। মুহুর্তের জন্যে মনে হয় আর তো কটাদিন, তারপর সব বন্ধ দরজা হুড়মুড় করে খুলে যাবে, আমরা আবার ফিরে যাব আলো বাতাসের জগতে। সেই অলৌকিকের সঙ্গে দেখা হবার আগে শান্ত ভাবে বাড়িতেই আর একটু অপেক্ষা করি না সবাই!

Write comment (6 Comments)

WhatsApp Image 2018 10 04 at 23.19.09

 সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন পুজোর একটুকরো
 পাপিয়া ভট্টাচার্য

 

 সারাদিন অসহ্য একটা গুমোটের পর ভোররাতে বৃষ্টি নামল। তার মানে আর একটু পরেই শুরু হবে দুর্দান্ত একটা ভিজে ভিজে সকাল। টিনের চালে শব্দ হচ্ছে ঝমঝম ঝমঝম। এই শব্দটার সঙ্গে বহুদূর থেকে একটা চেনা সুর ভেসে আসে, খুব মনকেমন করা, খুব আপন করে জড়িয়ে নেওয়া একটা সুর। ওই ঝমঝম শব্দ আর এই সুর, দুয়ের লোভে দেশের বাড়ির এই পুরোনো অংশের গন্ধ ছেড়ে নতুন তৈরি হওয়া সুন্দর বাড়িটার সাজানো ঘরগুলো আমাকে একটুও টানে না। পেছনের ছোট্ট বাগানের চাঁপা আর অমলতাস গাছ পেরিয়ে তীর্থসায়রের ঘাট, আর তার ওপরে বিস্তৃত মাঠ, সব মিলিয়ে আমার এই পুরোনো একার ঘরখানা এত সম্পূর্ণ যা থেকে কিছু মাত্র বাদ গেলেও জায়গাটা আমার অচেনা হয়ে যাবে। খাটের পাশের এই জানালাটায় বসে দূরের ওই শান্তিপুরের মাঠ পেরিয়ে বৃষ্টির ঝাপসা হয়ে ছুটে আসা দেখেছি কতবার। আর এখন এই ঘুম ঘুম চোখে বৃষ্টিভেজা এক ঝলমলে সকাল হতে দেখা এত আনন্দের যে গত দুদিনের নির্ঘুম রাতের কথা মনেই পড়ছে না।


দেশের বাড়িতে এসেছি মাত্র দুদিন হল। পুরোনো বাড়ির এই ঘরটাতেই থাকব জেদ করায় আঙুর কাকিমা আমাকে পাহারা দিতে এসেছে। আঙুর আমাদের বহুদিনের ভোগ রান্নার লোক। 'ভয় পেয়ো নি, আমি তো আছি' বলে এমন ঘুম তার সে সারারাত টিনের চালে খটখাট দুমদাম শব্দ, আমার বারবার ওঠা বসা, কোনোকিছুতেই হেলদোল নেই। কুমার, দেশের বাড়ি সারাবছর যার দায়িত্বে থাকে, সে অবশ্য বলেই দিয়েছিল, ইঁদুর লাফায় টিনের চালে, পেয়ারা খসে পড়ে শব্দ হয়।


আমার মনে পড়ল, কাল সারা বিকেল ধরে যত্ন করে আল্পনা দিয়েছিলাম উঠোনে, সব ধুয়ে যাচ্ছে। পূরবে আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে !


নতুনমা উঠে পড়েছেন চটির অস্থির ফটফট শব্দ তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশের বাড়িতে চটি পরার রেওয়াজ ছিল না কিছুদিন আগেও। গাড়ি থেকে নেমেই জুতো খুলে ফেলে খালি পায়ে দুর্গাদালান আর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি চালান হত সিঁড়ির তলায়। বাকি দিনগুলি আমরা জুতো নামক বস্তুটির কথা বেমালুম ভুলে দিব্যি ঘুরে বেড়াতাম ধুলোকাদা মেখে। মনে পড়ত সেই ফেরার দিন। বস্তাচাপা ধুলোভরা জুতোগুলি বের করে দিচ্ছে আমাদের পুরোনো লোক ন'বউ, আমরা 'আরে, এটা আমার নয়', 'দূর, বাঁ পায়ের জুতোটা কোথায় গেল' করে সম্মিলিত চেঁচামেচি জুড়েছি আর অতি শান্ত ন'বউ একটি কথাও না বলে নিজের থানের আঁচল দিয়ে ধুলো মুছে এগিয়ে দিচ্ছে জুতোগুলি, এতো এই সেদিনের কথা যেন !

 

ন'বউ কবে চলে গেছে, জুতোও ওখানে থাকে না আর। হঠাৎ কোনোদিন ওপরে ওঠার সময় ওই জায়গাটায় চোখ পড়লে ওর কথা মনে পড়ে। সারাদিনের কাজ শেষ করে ছোট্ট লণ্ঠনটি দুলিয়ে বাড়ি ফিরছে ন'বউ, বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই একটুখানি আলোর দুলতে দুলতে দূরে যাওয়া দেখে কত কী কল্পনা করতাম !


ঝিরঝিরে বৃষ্টির সঙ্গে পাক খেয়ে ওপরে উঠছে ধোঁয়া। দুটো আঁচ একসঙ্গে ধরিয়ে দিয়েছে মল্লিকা। স্নান করতে যেটুকু সময়, দৌড়ে আসতেই গনগনে আগুন, ভোগ বসে গেল। নতুন মা হায় হায় করছেন, কখন কি হবে ! উঠোনের ওপর আমার আল্পনা ভোরের বৃষ্টিতে অর্ধেক ধুয়ে গেছে, বাকিটুকু পড়ে থাকা ঝরাপাতার সঙ্গে ঝেঁটিয়ে বার করে দিতে দিতে সারথি বলল, গোল করো নি দিনি, সব হবে ! সবেতে টেনশন করলে হয় !


সারথি আজকাল কথায় কথায় ইংরেজি বলে। একটু আগেই বাসন ধুয়ে আসতে আসতে মেঝেতে বাটি পড়ে গেল একটা, ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, সরি।


একমেটে প্রতিমার কাঠামোয় মাটি পড়বে আজ রথের দিনে। বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোতে আমরা দেশের বাড়ি আসি। উলু, শাঁখ, কাঁসরঘন্টা বাজছে। বাড়ির সবচেয়ে বর্ষীয়ান মানুষ কাকু কাঠামোয় প্রথম মাটি ছোঁয়ালেন। দালানের বাইরে শ্যাম মিস্ত্রী আমাকে বোঝাচ্ছেন কিভাবে কাঠামোর ওপর প্রথম খড়কুটি মেশানো মাটির একমেটে হবে। দোমেটেতে চটকুচি মেশানো মাটি চাপানো হবে তার ওপর। প্রতিমার আঙুল? ও তো মাটির সঙ্গে তুলো মিশিয়ে। এতে ইচ্ছেমত মোড়া যায় আঙুল।


ভাল শ্রোতা পেয়ে শ্যাম দা খুব খুশি। আমাকে ভালওবাসেন খুব। অনেক বছর ধরে ঠাকুর গড়ছেন এবাড়ির সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন পুজোটির।


পুরোহিত নিখিল কাকার সঙ্গে, উনি আবার স্কুল শিক্ষকও, জোর তর্ক চলছে তন্ত্রধারক নন্দদার। নারায়ণ পুজোয় বেশি ফুল থাকা দরকার কেন ! আমাকে সাক্ষী মানলেন নিখিলকাকা। এই তো পাপিয়া আছে, ও ও জানে ! বইটই পড়ে তো অনেক ! কি গো পাপিয়া, সাদা ফুল...!


আমি তাড়াতাড়ি ঘাড় নাড়লাম, জানি না। এ বিষয়ে আমি আমার বাবার মতো, গাছের ফুল গাছেই রাখতে ভালোবাসি। লাল সাদা কোনো ফুলই ছিঁড়ে কারো পায়ে দিতে ইচ্ছে করে না।


রাসভোগ বাড়তে বাড়তে আমার মনে পড়ছে বড়দাকে। পিসতুতো ভাসুর আমার ভোগে আমাকে দেখলেই উঠোন থেকে মজা করে চেঁচাতেন, এই খেয়েছে, ভোগে আজ পাপিয়া নাকি ! মা দুর্গা সময়ে খেতে পাবে তো আজ !


বলা নেই, কওয়া নেই, দুম করে চলে গেলেন বড়দা। পূর্ণাহুতির সময় কাকাজীর চোখে কি ওপারে গিয়েও জল পড়ে ! সপ্তমীর ঘট তোলার সময় পূর্ণ ঘট কাঁখে নিয়ে বড়মা বলতেন, দ্যাখো দ্যাখো, আশি বছরের বুড়ি আমি,এখনও...। আর তোমরা সব ষোলো বছরেই..!


আশির নিচে সবাই ষোলো বড়মার কাছে। পুজোটা এখনও ফাঁকা লাগে বড়মা ছাড়া।


আকাশে আবার মেঘ জমেছে। মেঘের পরে মেঘ, আঁধার করে আসে ! খাওয়া শেষ হতে না হতেই মেঘের ছায়া জমাট সন্ধে নামিয়ে দিল। আঙুর কাকিমা ঘরে ঘরে ধুনো দিতে দিতে বলছে,রথের দিন, বৃষ্টি হবেনি।


আমার পুরোনো ঘরের প্রিয় জানালায় বসে আছি। চাঁপা, অমলতাস ভিজে ভিজে বেশ ছায়া ঘনাইছে বনে বনে ! বিদ্যুৎ চলে গেছে, দালানের ভেতর। হ্যাজাক জ্বেলে একটু একটু করে প্রতিমা নির্মাণ করছেন শ্যামদা। দালানের ওই আলোটুকু ছাড়া গ্রামের সবখানে নিভৃত রজনী অন্ধকার ! টিনের চালে মধুর ঝমঝম শব্দ। আহা, শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে..., তোমার ওই সুরটি আমার...!

 

  (স্মৃতিকথাটি মহুল উৎসব সংখ্যা ১৪২০ থেকে সংগৃহীত )

Write comment (1 Comment)