Author

Antara Dawn ।। অন্তরা দাঁ

বসন্ত-পুরুষকে একটি খোলা চিঠি
অন্তরা দাঁ

এই যে... 
শুনছ?  প্রাণ আমার?  আমার বসন্ত-পুরুষ
সেদিন ইস্কুল থেকে ফিরছি, এলোমেলো পায়ে হাঁটা পথ কুমারী মেয়ের সিঁথির মত পরিচ্ছন্ন নেই আর, হরজাই পাতা ঝরছে জানো, ভার্সিটি'র পুবের রাস্তা ধরে... 
ওই রাস্তাটা মনে আছে তোমার?  ওই যে চীনে রেস্তোরাঁ'র সামনে দুদিকে লোহার লম্বা বাতিদানের মাথায় টোপর দেওয়া আলোর ফলক?  মনে আছে? শীত শেষের এক ছমছমে দুপুরে ওইখানে দাঁড়িয়ে তুমি আমার আঙুল ধরেছিলে, প্রথমবার নয়, তবু মনে আছে! 
সেই পাতাঝরা গাছেদের শুকনো কাঠির কঙ্কালের কোলাজ আকাশের নিনির্মেষ নীলের দিকে বাড়িয়ে, তারা খোঁজে!   যতদূর চোখ যায় হরজাই পাতারা খসে পড়ছে টুপটাপ, এই রাস্তাটি অনেকটা শান্তিনিকেতনের ভিতর যে রাস্তাটি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিভবনের সামনের দিকে দিয়ে চলে গেছে বল্লভপুর জঙ্গলের দিকে অনেকটা সেই রকম।  সকাল-বিকাল শিরশিরানি থাকলেও দুপুরের দিকে একটানা কাজ করতে করতে একঝলক ফ্যান চালালে বেশ লাগছে! ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পেছন দিকের মাঠে, ফসল-ওঠা শূন্যতা, খোঁচা খোঁচা খড়ের নাড়া, দুদিন পরই দোল, নাড়া পোড়ানো হবে, বুড়ো-বুড়ির ঘর পুড়বে দোলের আগের দিন সন্ধ্যেয়! আকাশে তখন সোনার থালার মত চাঁদ! 
দুপুরে ধুলোর ঝড় ওঠে, গোল করে শুকনো পাতা ওড়ে, ধুলো উড়ে চোখে, গলায়, জ্বালা জ্বালা করে,ঠিক যেমন তুমি দুদিন দাড়ি না কাটলে হয়!  আমার উত্তর-যুবকের চিবুকের রুক্ষ আদরের মত। 
রোজ রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ছাদে গিয়ে দাঁড়াই, হু হু হাওয়া এসে আমার ভাবনাদের উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফ্ল্যাটবাড়ির খোপ খোপ ঘরে আলো জ্বলে, কোনটায় অন্ধকার, সব মানুষের ঘরবাড়ি!  সুখের খোপ, দুঃখেরও। পুতুলের সংসার দেখি, সাজানো-গোছানো। আলাদ আলাদা অথচ কী ভীষণ একঘেয়ে। স্বামী-স্ত্রী, বিছানা-বালিশ, হাঁড়ি-পাতিল, ন্যাকড়া-চোকড়া, মা-তারা মার্কা ক্যালেন্ডার, সস্তার রেডিও, দামী টিভি, এসি, ফ্রিজ, সব রেখাই সমান্তরাল, তবু বৃত্ত হয়ে যায়, হয় কি?  কি করে হয়?  এ নিয়ে আরেকদিন বলব তোমায়। 
পলাশ ফুটেছে। তোমার মত একলা পলাশ। তুমি যেমন হাজার ভীড়েও আলাদা। আমার প্রেম, আমার বসন্ত এসব কথা লিখছি তোমায়, সব কথা যে মুখে বলতে পারিনা, যা বলা গেল না তা হলুদ-বসন্ত পাখির মতই কবুতরী চিঠির অক্ষরে তোমায় জানিয়ে দিক সেই প্রেমকাতরী আমার বেহায়া আবেগ!  শিমুলের নরম মাংসল শরীর পড়ে থাকে ধুলো'য়, ঘাসে, শুকনো খড়ে, দেখে  গা শিরশির করে আমার। ঠিক তোমার জ্বরঠুঁটো উঠলে অমন ক্ষত হয়, কালচে-লাল, রসালো। বোরোলিন সরে গেলেই শিমুলের থ্যাঁতলানো পাপড়ি! 
এত রঙ, কুসুম গাছে এত আগুনের শিখার মত ফুল, পাতা, তবু তুমি যে কেমন করে আমায় এক নিশ্ছিদ্র শূন্যতায় মুড়ে রাখো অনুক্ষণ, এক ব্যাথাগর্ভ সুখ, টনটন করে ওঠে আমার জরায়ু। তিরতির করে বসন্ত-সুখে! হাওয়ার দীর্ঘশ্বাসে মিশে থাকে তোমায় না পাওয়ার আক্ষেপ, তবু তো প্রেম, একবার ডাকলেই আমি পাহাড়ি-ঝোড়া, আমি ফাগুন-বউ,আমি চৈত্র রাতের একলা হাওয়া মাতাল! 
আমার প্রাণবান পুরুষ-প্রেম, আমার বসন্ত-সখা, বছর শেষে ঝড়-বাদলের ফ্লাইট ধরে চলে যাও, আবার আসবে বলে?  আদরে -আবেগে ভাসাবে বলে?  আবার ভালোবাসবে বলে? 
তোমার 
প্রেমকাতরী... 
Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault

মনকেমনিয়া
অন্তরা দাঁ 

বিষাদ রঙের মনখারাপ জড়ো করি দুঠোঁটে, মন ভালো নেই তাই। গুছিয়ে তোলা জীবন যেন ওভারহেডের তারে লেগে থাকা বৃষ্টিফোঁটা, এই ঝরে পড়বে টস করে। এবছর এই মাঝ-শ্রাবণেও মেঘ জমেনি তেমন, এ পাড়ার কড়া নাড়েনি বৃষ্টিফোঁটার বালিকারা। দল বেঁধে তারা সেই যে গেছে জষ্টিমাসের শেষের দিকে, আর পাত্তা নেই। তাদের ঘুঙুরকথা শুনব বলে পুরো আষাঢ় মাস জানলা খুলে তাকিয়ে রইলাম। কোথায় তারা? বৃষ্টিবিহীন মনখারাপ। কতদিন মেঘ মাখিনি, খোয়াইয়ের হাটে জীবনে ভরপুর সাঁওতাল মেয়েদের মদালসা তালে তালে ছুঁয়ে দেখিনা জীবন, সস্তার বিকিকিনি, গাঁয়ের লালমাটির আন্তরিক গন্ধমাখা, সবই কি হারিয়ে যায় সময়ের মস্ত হাঁ-মুখে?

বদলে যাচ্ছে সব —জীবন, ইচ্ছে, সময়, মূল্যবোধ। ভাগ্যিস বদলাচ্ছে না হলে যে থমকে যেত সব। পুনরাবৃত্তি তো সৃজন নয়। সৃজনের সাথে বদলের সম্পর্ক যে ধরতাই ধরা দম্পতির মত অম্ল-মধুর। মনকেমনের যে কোন মানে হয় না, অকারণ বলেই তা সততই মনের ঘর একই সাথে দুঃখসুখে ভরিয়ে তোলে। রূপকথার রাজপুত্তুর সোনার রথে চড়ে একদিন ঠিক হাজির হবে মায়ারাজ্যের রাজকন্যের কাছে, কেঁদে কেঁদে তার চোখমুখ লাল টসটসে, রাজপুত্র তার বাগানের সেরা লাল গোলাপটি কন্যের এলোচুলে গেঁথে, কানে কানে ফিসফিস করে বলবে "ভালোবাসি"। এর অন্যথা হলেই যে মনখারাপ।

শাসন শাসন চোখের সোনার বরণ মা দুগ্গা দশমীতে জলে পড়লেই মনখারাপ। জমিদারবাড়ির দরদালান একেবারে খাঁ খাঁ। বাবা-কাকারা মুখ ভারী করে বিজয়ার কোলাকুলি সারে। মায়েদের মনখারাপের সময় কোথায়? সামনে কোজাগরীপুজোর জোগাড়যন্ত আছে না! তবে কিনা
বাপের বাড়ির ঠিকানায় পোস্টকার্ড একখানা, সেতো কবেই উঠে গেছে, ফোনে ফোনেই বিজয়া সারে সব। আবার দেখাও যায় ভিডিও কলে। মনখারাপের জো টি নেই, তাই বুঝি এত মনখারাপ সবার? সতেরো বছরের কিশোর ছেলে ড্রাগ-পেডলার, মুঠো মুঠো এ্যন্টিডিপ্রেশনের ওষুধ
খায় বছর উনিশের তরুণী ছাত্রীটি। সাবেক বাড়ি ভেঙে বহুতল আবাসন, ঘড়র ঘড়র লোহার ফ্যানের বদলে এ.সি. র ফুরফুরে হাওয়া, দলবেঁধে পিকনিক, চড়ুইভাতির বদলে লেট-নাইট পার্টি, জোম্যাটো, সুইগী। শালপাতার দোনা হাতে ফুচকা-আলুকাবলির দোকানে আর ভীড়
জমায় না দুবিনুনী হরিদাস ইস্কুলের মেয়েরা, আরো চাপা জীনস, বয়কাটরা, মোমো খায়, ফ্লেভার্ড পপকর্ন। গাঁয়ে-গঞ্জে, মিউনিসিপ্যালটির মাঠে এখন আর সাদা কাপড়ে প্রোজেক্টার ফেলে সিনেমা হয় না, ইউ-টিউবে থ্রিডি মুভি দ্যাখে স্মার্ট জেনারেশন।

তা হ্যাঁ গো মনখারাপের বদলি কিছু পেলে নাকি?!মনখারাপ করার উপায় না থাকাটাই যে মস্ত মনখারাপ। ছোটদের শৈশব নেই, স্বার্থপর লোভী মা বাপ তাদের সেলেব বানানোর অসুস্থ ইঁদুর দৌড়ে নামিয়ে দিয়েছে সস্তা হাততালির মোহে। গোলগাল বাচ্চা মেয়েটি রাতদিন গলা সাধছে। টিভিতে বিজ্ঞাপন —জীবন মানে... কি যেন বাংলা! তরুণী মা, শপিংমলে হঠাৎ দেখা দূর আত্মীয়ের কাছে বেশ ঘ্যাম নিয়ে বলে "ওতো নেক্সট পারফর্ম করছে মুম্বাইয়ে"। এদিকে মনখারাপের অবাধ্য গিঁট দড়ি হয়ে চেপে বসে প্রথম না হতে পারা মেয়ের গলায়। এ বাবা! এবারও সেই মনখারাপ। দুত্তোর শালা! ভিলেন মনখারাপ।

অথচ তোমার-আমার মনখারাপ হয় বলেই বিষাদকাব্য লিখি, অন্ধ বাউল সুর তোলে একতারায়। কন্যাশ্রী পাওয়া মেয়ে থানায় যায় বিয়ে আটকাতে, কোটিপতির বখে-যাওয়া ছেলে বডি অরগ্যান ডোনেট করে। খোঁড়া কুকুরকে খেতে দেয় ভ্যানে শুয়ে রাত-কাটানো
লেবার,ডিউটি সেরে ফেরার পথে রাস্তায় পাওয়া মানিব্যাগ ফেরত দেয় রাতের আয়া, পেশায় সুপারি-কিলার বছর পঞ্চাশের, মুখে কাটা-দাগ, নিষ্ঠুর কসাই, ডাস্টবিন থেকে বুকে করে কুড়িয়ে আনে ফেলে দেওয়া শিশুকন্যা।

মনখারাপ বড় বালাই। " এই তো জীবন কালীদা " বড় জড়ানো মড়ানো মনভোলানো মনখারাপের জীবন। বড্ড মনখারাপ।

Write comment (1 Comment)
0
1
0
s2sdefault