Author

Sukanta Sinha ।। সুকান্ত সিংহ

প্রেমপত্র
সুকান্ত সিংহ

পূর্বা,
      আমাদের একদিন আসনবনিতে নেমে পড়ার কথা ছিল, মনে আছে? আমি পাহাড় ভালবাসতুম। একটু ধুসর পাহাড়। তুই জঙ্গল। আমার পছন্দ ছিল মণিকর্ণিকার ঘাট। তোর অজন্তা। আমি চিরকাল হেমেন্দ্রকুমার পড়েছি। তুই কাফকা। আমার প্রিয় বই আরণ্যক। তোর হার্বাট। ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন তুই পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়ে একটা হুলুস্থুলু ফেলে দিতিস। আমি তাদের লজেন্স দিতে দিতেই দিন কাটিয়ে ফেলতুম।  ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা দু'চোখে দেখতে পারতিস না। আমি ভাস্করের কবিতা তোকে জোর করে শোনাতুম। পাঞ্জাবির কলার নিয়ে আমার কোনো কালেই মাথাব্যথা ছিল না। তুই চিরকাল লোকের সামনেই কলার ঠিক করে দিতিস। আমি আজো খাবার আগে হাত ধুতে ভুলে যাই। তুই হাত না ধুয়ে এলে  কিছুই খেতে দিতিস না। পলাশ ছিল তোর প্রিয় ফুল। আমার জুঁই। প্রতিমা বড়ুয়া শুনতিস খুব। আমি একটু আধটু অমর পাল। ডুয়ার্সের জঙ্গলে হারিয়ে যেতে যেতে ঘুমিয়ে পড়তিস। আমি তখন আসনবনিতে নেমেছি। রবীন্দ্রনাথের অমল তোর ভাল লাগত, যে অমল রাজার চিঠির জন্য বসে থাকে। আমার ভাল লাগত কিশোরকে, মারের মুখেও যে রক্তকরবী নিয়ে আসে।

      পূর্বা, তুই এখন আর কারো চিঠির জন্যই হয়তো অপেক্ষা করিস না। আমিও আর মারের মুখের থেকে রক্তকরবী আনতে যাই না। শুনেছি তোর স্কুলে একটা রক্তকরবী গাছ লাগিয়েছিস। ফুলের ভারে সে নুয়ে নুয়ে পড়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই ফুল তোকে মাঝে মাঝে তুলে এনে দেয়। তুই কখনো কখনো খোঁপায় গুঁজে রাখিস। শুনেছি। কথা ভেসে আসে। কথার কাজই এই, ভেসে আসা। আমার মতো ভেসে যাওয়ার স্বভাব তো তাদের নেই। এ ঘাট থেকে ও ঘাট ভাসতে ভাসতে যখন খুব ক্লান্তি আসে, ভাবি, নিজের একটা ঘাট থাকলে হোত। জানি, এমন কথা শুনলে তুই হেসেই কুটোপাটি খাবি। সেই আগের মতোই বলবি, বাবুর মুখে খই ফুটেছে।

      মা এখন ভাল আছেন। সেই ময়ূরের নক্সা তোলা আসনটা তুলে রেখেছেন। এখনো ভাবেন তুই কোনো দুপুরে মিছিল থেকে এসে বলবি, ভাত দাও, খুব খিদে পাচ্ছে। মা ওই আসনটাই পেতে ভাত দেবেন মনে মনে ভাবেন। মুখে কিছুই বলেন না। তিনি হয়তো বুঝে গেছেন, তোর বা আমার উপর তাঁর কোনো জোর নেই। তাঁর জোর শুধু ওই আসন পেতে ভাত বেড়ে দেওয়ার উপরেই।

      রঘু আসে এখনো। গান শুনিয়ে যায়। এই শীতে সে একটা কম্বল চেয়েছিল। দিয়েছি।  কম্বলটা নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, দিদিমণিরে অনেকদিন দেখি নাই। বললুম, দেখা হলে তোমার কথা নিশ্চয়ই বলব রঘু। সে বলল, দিদিমণিরে বলবেন একটা নতুন পদ বেঁধেচি, সুরটা তিনি ধরিয়ে দিলেই গাইতে পারি। তারপর সে চলে গেল।

       পূর্বা, মা আসন নিয়ে বসে থাকেন, রঘু পদ রচনা করে বসে থাকে, ২১শে ফেব্রুয়ারির সেই বাচ্চাগুলো অপেক্ষা করে কখন তুই ভোরবেলা তাদের নিয়ে গাইতে গাইতে বেরোবি আ মরি বাংলা ভাষা।

      আমাদের একদিন আসনবনিতে নেমে পড়ার কথা ছিল, পূর্বা।
                             ইতি--

 

Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault

ভাষাই তরণী
সুকান্ত সিংহ

এক পর্যটক গেছেন কায়রোর মিউজিয়ামে। গাইড তাঁকে সেই দেশের নানান প্রাচীন সামগ্রী দেখাতে দেখাতে নিয়ে এল বিখ্যাত ফারাও তুতেনখামেনের ব্যবহার করা কুড়ুলের কাছে। পর্যটক আপ্লুত। এমন একটি কুড়ুল, যেটি কিনা ব্যবহার করেছেন ফারাও তুতেনখামেন! তিনি গাইডকে জিজ্ঞেস করলেন-- আপনারা এত চমৎকার ভাবে কুড়ুলটা রেখেছেন কী করে? গাইড বলল-- স্যর, কুড়ুলের হাতলটা দশবার, আর ফলাটা পাঁচবার শুধু পালটাতে হয়েছে।

বাংলা ভাষা সেই কুড়ুল থেকে খুব দুরে নেই।

সত্যজিৎ রায় বাংলা ভাষা নিয়ে ঠিকই বলেছিলেন গুপিগাইনের কণ্ঠে-- এই ভাষা এমন কথা বলে, সকলেই বোঝে, উঁচু নীচু কিছু নেই। আমি স্বীকার করি। তবে তার সাথে আমি শুধু স্মরণে রাখি প্রফেট সুকুমার রায়কে -- খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। বাংলা ভাষা এখন এই জায়গায়। আমরা খাচ্ছি, কিন্তু গিলছি না।

জানি, পৃথিবীর যেকোনো জ্যান্ত ভাষা গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে দিয়েই চলমান থাকে। অনেকদিন ধরেই চেয়ার-টেবিল একটি বাংলা শব্দ, খাতিয়ান একটি বাংলা শব্দ। তাদের জন্মস্থান যাই হোক, তারা আজ বাংলা শব্দ। মহাবিদ্যালয় শব্দটা গেটের উপরে অর্ধবৃত্তাকারেই রয়ে গেছে, আসলে ওটা কলেজ। যতই লোকে ক্যালকাটা-কে কলকাতা বলার জন্য জোর করুক, আসলে কলকাতা দাঁড়িয়ে আছে ক্যালকাটার কাঁধেই। নতুবা, কলকাতা আদপেই কলিকাতা ছাড়া কিচ্ছু নয়, ক্যালকাটা-কে বাদ দিয়ে সে গোবিন্দপুর সুতানুটির সহোদরা মাত্র। ওই যেমন বিখ্যাত বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন-- 'ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর', এখানে শুধু 'মোর' শব্দটি আছে বলেই ওটা ইংরেজি বাক্য হয়ে গেল না, তেমনই।

আমি ভাষাবিদ্ নই, ভাষা-ব্যবহারকারী। জন্মসূত্রে যে পরিবেশ পেয়েছি সেখানে বাংলা ভাষা প্রধান। আমার উর্দ্ধতন চোদ্দপুরুষ আমার মতোই এভাবে পেয়েছেন বাংলা ভাষাকে। এই ভাষা আমার মাতৃভাষা। এর প্রতি আলাদা দুর্বলতা থাকাই স্বাভাবিক। ভিন্ন ভাষার প্রতি ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই। সেগুলোও তো কারো না কারো মাতৃভাষা। যখন জোর করে কেউ কোনো ভাষা চাপিয়ে দেয়, ক্ষুব্ধ হই তখনই। ভাষার চলনে যে ভিন্ন ভাষা এসে পড়ে, তা ভাষাআবহাওয়ার একটি অংশ। তা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এইসব চাপিয়ে দেওয়া দেখি, তখনই ক্ষুব্ধ হই। মনে রাখা ভাল, ভাষা শুধুই ভাবের বাহক নয়। ভাষা নিজেই একটি সভ্যতা। চাপিয়ে দেবার সময় তা আর সভ্যতা থাকে না, তখন সে একটা টুল। দখলদারির যন্ত্রাংশ।

একটা ভুল ধারণা খুব ঘোরে বাজারে, সেটা হল, চাপিয়ে দেওয়ার কাজটা শাসক করে শুধু। মোটেই তা নয়। এই কাজ একমুখী নয়। আমরাও করি। সেটা অনেকাংশে তথাকথিত স্মার্টনেস দেখাতে, কোথাও আবার অজ্ঞতা থেকে। পৃথিবীর যেকোনো ভাষা জ্যান্ত থাকে তাকে ব্যবহার করলে। সেখানে নজর না দিয়ে শুধুই একে তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

আমরা জন্মেই দুটো জিনিস সহজে পেয়েছি, খিদে আর মাতৃভাষা। এ দুটোর কোনোটাই আমৃত্যু আমাদের ছেড়ে যায় না।

এঁদের নমস্কার।

 

 

Write comment (1 Comment)
0
1
0
s2sdefault

বিকেল রঙের মনখারাপ
সুকান্ত সিংহ

এই যে বিকেল নেমে এল কাঁশাইপাড়ে। ওই যে ওপারের ঝোপে সন্ধ্যার আয়োজন শুরু হল। শেষবারের মতো জাল টেনে গুছিয়ে রাখল অনন্ত মালো। দু একটি সাইকেল চলে গেল ঘরের দিকে। এই যে জল থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাঁশের সাঁকোর প্রতিচ্ছবি–আমি এসবের মধ্যে কবেকার তোরঙ্গে রাখা জামাকাপড়ের ভাঁজের ন্যাপথ্যালিনের গন্ধ পাচ্ছি কেন!

অনেক দূর থেকে, বোধহয় গঙ্গাপ্রসাদের আটচালার থেকেই, ভেসে আসছে এক বালিকার কণ্ঠস্বর। রাধারাণী যমুনা পেরোবেন। ছোকরা মাঝি তার কাছে দাবি করছে কানের দুল। দিতে পারো কি না-পারোর দ্বিধার মধ্যে বসে রয়েছেন হ্লাদিনী। কিংবা, যাকে সর্বস্ব দিতে চান, সে কিনা শুধু কানের দুল চাইছে! এইটি তাঁকে ব্যথা দিচ্ছে। বালিকার কণ্ঠ বুজে আসছে। দোহার স্তব্ধ। শ্রীখোল মৃদু। আমার খুব ইচ্ছে করছে একবার বলি–ও গানের বালিকা, তুমি পরের পদ ধরো, পারাপার থমকে রয়েছে যে! আয়ানের কথা কিছু হোক।

গাইতে গিয়ে এখন কথা ভুলে যাই, সুরটুকু কণ্ঠে রাখি– বলেছিল একজন। সে কীর্তনের দলে খঞ্জনি বাজাত। তার কণ্ঠে ছিল শুধু দোহারের শব্দ। শেষ বয়সে আর কণ্ঠও ছিল না। গৃহস্থ ঘরের উঠোনে শুধু খঞ্জনি বাজাত। কখনো কখনো তার রোগাভোগা ছেলে আসত। মুঠো চাল, পয়সা দিত গৃহস্থেরা। ছেলে চাল থেকে পয়সা বেছে ভরে দিত বাপের ফতুয়ার  পকেটে। বাপ তাকে শিখিয়ে ছিল হাত তুলে নমস্কার করতে। সে যখন নমস্কার করত, তার ছোট ছোট হাতের নমস্কার দেখে গৃহস্থঘরের বৌ-ঝিরা হেসে ফেলত। সে খুব লজ্জা পেয়ে যেত। সেই যে  একদিন যমুনা পারাপারের জন্য হ্লাদিনী রাধারাণীর কাছে কানের দুল দাবি করেছিল, সেই লজ্জা পেয়ে যাবার আড়ালে কেউ ধরতেই পারত না! তারও কি আর মনে পড়ে? জিজ্ঞেস করা হয়নি।

খেলতে গিয়ে যে ধুলো লাগে তাকে ডরাই  না। মুছতে গিয়ে যে কালি লাগে তাকে ডরাই না। হাঁটতে গিয়ে যে কাঁকর বেঁধে তাকে ডরাই না। বলতে গিয়ে যে ভুলগুলো হয়, তাদের পাশে থাকি। একজন মানুষ যদি তার ভুলগুলোকে তাচ্ছিল্য করে, তাহলে তার আত্মা মরে যায়।

ওই ভুলটুকুই তো পাতের লবণ। ভাতে মাখি বা নাই মাখি, পাতে থাকলে মনে হয় আমার মা ভাত বেড়ে দিয়েছে।

একজন মানুষ বিকেল কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে ফিরছে। তার ঘর কখনো বাস্তুসম্মত ছিল না। তার বুকপকেটে কবেকার পুরোনো জামাকাপড়ের গন্ধ। রোদের গন্ধ। বুড়ি দিদিমার গন্ধ। তার এলোমেলো ঘরের ভিতরে কবেকার একটা পাহাড় ঝর্ণার গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কবেকার একটা পলাশফুল একটি কালো মেয়ের সেলাই মেশিনের গল্প বলবে বলে জেগে বসে আছে। কবেকার কুড়িয়ে আনা একটা পা ভাঙা মাটির ঘোড়া অপেক্ষায় আছে। বিকেল কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে ফিরছে একজন মানুষ। তার সব মনখারাপই বিকেল রঙের।

তার সব গল্পই এইরকম।

Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault

WhatsApp Image 2018 10 04 at 23.19.09

 
কথামাত্র 
সুকান্ত সিংহ
 

এক সাধু ছিলেন শ্রীবৃন্দাবনে। অন্ধ। রোজ হেঁটে যেতেন বাঁকেবিহারীর মন্দিরে। একেক দিন কেউ কেউ তাঁকে হাত ধরে এগিয়ে দিত। তিনি সাহায্যকারীকে হাতজোড় করে নমস্কার করতেন। এরকমই একদিন একজন জিজ্ঞেস করেছিল--'আপনি তো দেখতেই পান না, তবু রোজ কেন কষ্ট করে যান ?' সাধু মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন --'আমি দেখতে পাই না ঠিকই, কিন্তু বাঁকেবিহারী তো আমাকে দেখতে পান।'

উত্তরটি আস্থার। অবশ্যই তাই। সাথে কি সংযোগেরও নয়? কোনও গুঢ়তত্বের ব্যাখ্যাময় উত্তরের চেয়ে এই যে দেখার অন্য দিক দেখা হল, এ তো আস্থার সাথে বাকের সংযোগ। নিশ্চয়ই এই যোগসূত্র অনায়াস লভ্য নয়। আবার এতটাও অসাধ্য নয় যে ধরা দেয় না।

নন্দিনী যখন রাজাকে বলে--'আমার সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমার সঙ্গে লড়াই'-- এই 'লড়াই' শব্দটি তখন আর কেবল রাজাকে লক্ষ্য করে নয়, এই লড়াই হয়ে ওঠে সমস্ত স্থবিরতার বিরুদ্ধেই। এই একটি মাত্র সংলাপ রক্তকরবীর অভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্যকে প্রতিভাত করে তোলে। অথচ গুনে দেখলে কটি মাত্র শব্দ। একটি মাত্র বাক্য।

গুটিয়ে বসা পাখির ডানার বিস্তার বোঝা যায় না। তার অস্তিত্ব ধরা পড়ে ওড়ার মূহুর্তে। তখন আর সে শুধু পালকগুচ্ছ নয়, সে তখন বিস্তারের নিজস্ব টোটেম।

ভাব আর বাকের সাযুজ্য সবসময় এক বিন্দুতে মেলে না। উচ্চারণের প্রতিশ্রুতিই বাকের সার্থকতা বয়ে আনে। ভাব তো মননের সাথে সম্পর্কিত।
'বাঙ মে মনসি প্রতিষ্ঠিতা, মনো মে বাচি প্রতিষ্ঠিতম্' বাক্য মনে প্রতিষ্ঠিত হোক, মন বাক্যে প্রতিষ্ঠিত হোক এই ইচ্ছে প্রকাশ করার পর বলা হচ্ছে 'অবিরাবীর্ম এধি, বেদস্য ম আণীস্হ' হে স্বপ্রকাশ আমার কাছে প্রকাশিত হও। এই ছিল একসময় ঋকবেদের প্রার্থনা। বাক্ আর মননের পারস্পরিক সংযুক্তির পরেই কিন্তু আসছে বিরাটের ধারণা।

অথচ বৃহতের আধিপত্য দেখতে দেখতে একসময় ভুলেই গিয়েছিলুম তার আগের তথাকথিত স্বল্পতা আমার দৈনন্দিন মোরাম রাস্তার সঙ্গি। তার জড়িয়ে থাকাকে সময় বিশেষে এতটাই উপেক্ষা করেছি যে, যখন তার প্রকাশ দেখি, তখনও তাকে সন্দেহ করি -- তাই? তুমি ছিলে আমার সঙ্গে ! এও এক অসুখ। যা দানা বেঁধে আছে আমার পারিপার্শ্বিকের সাথে।

একটা পুরাতন বিশাল কাঠের দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তার গায়ে অচেনা ফুলপাতা নকশা খোদাই করা। দরোজার ওদিকে যে আছে , তাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি--একদিন আমাদের একসাথে দিগন্তে গিয়ে দাঁড়াবার কথা ছিল। দরোজার বালা ধরে বারকয়েক নাড়া দিলুম। একটা বিশাল দরোজার সামান্য একটা বালা ওদিক থেকে সাড়া বয়ে আনল-- কে?
আজও কাউকে দরোজার এপার থেকে ডাকতে গেলে মনে পড়ে কেবল গুলপেরেক নয়, কেবল ফুলপাতার নকশা নয়, দরোজায় চুপ করে আছে সাড়া পাবার ছোট বালা !

এই জগৎব্যাপি রাশি রাশি শব্দের সমারোহ, এইযে বলার পর বলা, আরো আরো বলা আমাদের ঘিরে ধরছে দীর্ঘতার অবয়বে, এর কতটুকুই বা জলকাদাপৃথিবীর নিজস্ব স্বর? অবিরাম কথাস্রোত কেবলই আরেক কথার কাছে মাথা খুঁড়ছে স্বীকৃতির জন্য বলে মনে হয়। স্বল্পে যা বলা যায় তাকে টেনে দীর্ঘ করার কোনও মানে নেই। সেও এক হত্যা, অবশ্যম্ভাবী দীর্ঘতাকে সংকুচিত করার মতোই আত্মহনন। অপব্যয়ের এক দাম্ভিক দেখনদারি।

আদপে মনন সূক্ষ্ম থেকে স্থূলে যায় উচ্চারণে পরিনত হলে। ভাবনার সূক্ষ্মতা কণ্ঠস্বরে হয় বৈখরি। আর এই কণ্ঠ থেকেই যাত্রা শুরু করে ধ্বনিবিজ্ঞান। যত বেশি প্রকাশ, তত বেশি স্থূলকায়। কেউ কেউ এর বিপরীত যাত্রাও করেন। সে যাত্রা থেমে গেলে নকশা কাটা দরোজা দেখতেই দেখতেই সময় বয়ে যায়, সাড়া পাবার বালা আর চোখে পড়ে না।

যার চোখে পড়ে সে একটিমাত্র শব্দ নিয়েই হেঁটে যায় অনেকটা পথ। একটা সাইকেলের ক্রিং শব্দও কোনও এক কিশোরীকে ব্যাকুল করে। ধাতব সেই শব্দকে ঘিরে থাকে হাজারো বাক্। যার চারদিকে থাকে আকূতির ঘন শ্বাস। আরো কেউ কেউ জেনে যায় ওই শব্দের মানে। তাদের পাড়াতুতো প্রতিরোধ এগিয়ে আসে। আধিপত্য জেগে ওঠে ক্রমে ।

বাক-প্রাচুর্যের মধ্যেই বিস্ময় চিহ্ন হয়ে থাকে অণুকবিতা। আমাদের ধাতুপৃথিবীতে তারা ডানা লুকিয়ে রাখে। কেবল খাদের কিনারে গেলে বোঝা যায় তার বিস্তারের সক্ষমতা। তারা থাকে ভাবনার সহোদর হয়ে। যুগলপ্রসাদের মতো লবটুলিয়ায় তারা পুঁতে চলে বীজ।

চন্দরা কহিল -- 'মরণ !'

যা বলতে চাই, তাকে সংকুচিত করে বলা নয়, বরং যেটুকু বলা হলেই 'অধিক' বাহুল্য হয়ে পড়ে, সেটুকুও না-বলাই অণুকবিতা। বাগাড়ম্বর থেকে এর অবস্থান স্বতন্ত্র ও স্বতঃস্ফূর্ত। আসলে চন্দরার ওই 'মরণ' উচ্চারণের সাথে সাথেই পূর্বের পংক্তিগুলির প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পায়। ম র ণ এই তিনটি মাত্র অক্ষর না থাকলে ব্যর্থতার চিহ্ন বহন করত শাস্তি।'
আমাদের স্বর্গ নেই স্যারিডন আছে'-- এই কথা বলা মাত্রই ভাস্কর হয়ে ওঠেন আমার ভাষাপৃথিবীর একমাত্র ঈশ্বর, যিনি কবির ছদ্মবেশে কটাদিন ঘুরে গেলেন।

অণুকবিতা মৃৎশিল্পীর হাতে গড়া সেই টেরাকোটা, যে আছে জোড়াবাংলোর শরীর জুড়ে। অণুকবিতা কুমার গন্ধর্বের কণ্ঠে জেগে ওঠা কবীরভজন। ঋত্বিকের অযান্ত্রিক। নবারুণের 'ভাল করে ঘুমোক। ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।'

অণুকবিতা হল রীনা ব্রাউনের -- 'আমাকে। টাচ্। করবে না।'
 
 
 ( গদ্যটি শারদীয় মহুল ১৪২৩ থেকে সংগৃহীত )
 
 
Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault
 IMG 20180320 WA0036
উপাস্য শস্যের কাছে
সুকান্ত সিংহ 
 
 
হেঁটে আসা সন্ধ্যাকে যে-বিকেল গড় করছে,
আমি তার আশেপাশে থাকি।
 
ভ্রমণের ছবি বলতে এটুকুই--
রাগাশ্রয়ী দিন গেছে দলমার দিকে
তাকে আর ফিরে আসতে কেউ দেখেনি।
জলের বোতল তার পড়ে আছে,
গাছতলায় চুপচাপ পুরানো সাইকেল।
গেছে সে তেমনি ভাবে যেমনটি হাঁস
ফেলে আসে পুকুরের স্মৃতি।
 
আমি শুধু এসবের আশেপাশে থাকি।
 
 
 
Write comment (4 Comments)
0
1
0
s2sdefault

IMG 20180320 WA0024

বুননপর্ব

সুকান্ত সিংহ

 

আত্মহননের ঋতুগুলি অতিক্রম করি

ধোঁয়াময় সন্ধেটিকে কেন্দুলী ফেরৎ বৈরাগী

ভরে নিচ্ছে তালি লাগানো ঝোলাতে।

বয়স পেরোনো নদীটিকে শরীর দিতে দিতে

আলকাতরা মাখা নৌকাটি শোনাচ্ছে 

গতকালের অতৃপ্তির কথা।

আত্মহননের ঋতু অতিক্রম করতে করতে

এইসব দৃশ্যের জন্ম হল।

 

 

Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault