Author

Suvasree Pal ।। শুভশ্রী পাল

শুভশ্রী পাল
সম্পর্ক-১

উন্মাদনার জীবনের কোনও পাঠক্রম আমাদের শেখানো হয়নি। বোধ হতেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আবাসিক ব্যবহারিক ক্লাসে৷ যেভাবে জন্মের পর গন্ডারশাবক শিখে নেয় জীবনের দৌড়, সেভাবেই আমরা শিখে নিয়েছি ইন্টিগ্রেটেড জীবন যুদ্ধ। আর এইসবের মধ্যে আমাদের অবলম্বন হয়ে উঠেছে যত্নবোধের শীতলপাটি জড়ানো সম্পর্করা। যেখানে কোনও পারফরম্যান্স এর স্কোর নেই। শুধু জ্বরের গায়ে যেভাবে ব লেপ্টে থাকে সেভাবে আমাদের সাথে লেগে আছে আন্তরিক সুখ। প্রতিটা যুদ্ধ শেষে  মিউট্যান্ট এর পোশাক খুলে রেখে আমরা সাবলীল যাপনে মেতে উঠি একে অপরের সাথে। শুধু এই ছুঁয়ে থাকারা বলে দেয়, যেভাবে যুক্ত হয়ে অক্ষর গড়ে তোলে সম্পর্ক সেভাবেই কখনও রেফ অথবা মাত্রা হয়ে আমরা আগলে রাখি একে অপরকে। আর যাপন করে চলি একটা আস্ত সম্পর্ক। যেখানে আলাদা করে ভালোবাসার সাবটাইটেল ফুটিয়ে তোলার প্রয়োজন হয় না। থার্ড ব্র্যাকেটের মতো আমাদের ঘিরে রাখে যত্ন এবং শুশ্রূষা।

সম্পর্ক -২
ঘুমের ভিতর জেগে উঠে দেখা হয়ে যায় শৈশবের সাথে। সারল্যের জামা গায়ে দিয়ে সে দুড়দাড় পায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে যে বাড়িটায় সেটা ভগ্নপ্রায় নাকি নির্ণীয়মান তা বুঝে উঠতে উঠতেই আছাড় খাওয়া এড়িয়ে সিঁড়ি টপকে চলে আসি বিছানার পাশে৷ চোখ বুজলেও যেসব বন্ধু আমাকে ছুঁয়ে থাকে তাদেরই একজন হাতের বই রেখে আমার দিকে মন দেয়। আমাকে শান্ত হওয়ার জন্য ঘুষ হিসাবে চুলে তেল মাখাতে বসে বন্ধু। এইসব দৃশ্যে বালিকা আমি বন্ধুর মুখে ভাইফোঁটার প্রদীপের আলো দেখতে পাই। আমার আগডুম বাগডুম এলোমেলো কথাদের খাঁজে খাঁজে সাজিয়ে দেয় উত্তরের বাঁধনে। এইসব দৃশ্যদের সাথে বন্ধুর টেলিযোগাযোগ হয়ে ওঠার বহু আগে, আলাপ হয়েছিল মৃত প্রেমিকের সাথে। তার পরামর্শেই বন্ধুকে আলাদা করে দাদা নামের জামা পরিয়ে সম্পর্কের হাঁসফাঁস আটকাতে আমি রেখে দিয়েছি রিসিভার। প্রেমিকের কাছেই শুনেছি সম্পর্কের রূপকথার গল্প। যেসব গল্প আজো অক্ষরে অক্ষরে তিন সত্যি হয়ে আমার বন্ধু আগলে রাখে আমার হুইল চেয়ারের গতি। ঘুমের ভিতরে জেগে উঠলে সে চুলে তেল মাখাতে মাখাতে আঙুল মটকানোর মতো একটা একটা করে ডিপ্রেশনের গাঁট ফাটিয়ে দেয়। অথচ এইসব দৃশ্যে আমরা কেউ কাউকে ছুঁতে পারি না। গলা জড়িয়ে দোল খাওয়া না হলেও আমরা অপূর্ব এক সুগন্ধি বাঁধনে বেঁধে বেঁধে থাকি। এইসব দেখা হওয়া হওয়িদের ছুটি হওয়ার সময় হলে বেজে ওঠে আরো এক বন্ধুর ডাক দেওয়া ফোন। দূরে কোথাও গান বাজছে। মৃত প্রেমিক এক আলোর বৃত্ত এঁকে দিয়ে গেছে আমার চারিপাশে। যেখানে এইসব সম্পর্করা তিন সত্যি হয়ে মনখারাপ, বিষন্নতা মুছে এঁকে দেয় আদর-আব্দারের আলপনা। খুনসুটির রঙ ঢেলে দিই পয়েন্ট জিরো তুলি দিয়ে। ধীরে ধীরে পাশ ফিরলে আমি দেখি সন্ধ্যে নামছে। যাই পড়তে বসি৷ 

 

Write comment (0 Comments)

ভাসমান ভাষা

শুভশ্রী পাল 

আমরা ভাষা দিবস পালন করি। একটা নির্দিষ্ট দিনে তার আড়ালে থাকা ইতিহাসকে সামনে রেখে গায়ে কাঁটা দেওয়া স্মৃতিদের তুলে এনে আমাদের ভাষাদিবস পালন হয়। অথচ কেউ উদযাপনের দিকে নজর দিই না।
ভাষা একটা যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে রয়ে গেছে মধ্যবিত্ত (মানসিকতার) বাঙালীর ঘরে। এখানে ভাষা আবেগ অথবা নস্টালজিয়ার স্বাদ চেনেনি। আর সেজন্যই কোনও ভাষাগত পিছুটান আমাদের বাঁধতে পারে না। বাসি পোশাকের মতোই আমরা বদলে ফেলি মাতৃভাষার আটপৌরে বাঁধন। ঝাঁ চকচকে অথবা স্মার্ট পোশাকের মতো জড়িয়ে নিই ভিনভাষা। পুরোনো সম্পর্কের মতো মনের দেওয়া-নেওয়া না থাকায় এই বদলের জন্য কোনও মনখারাপ কিমবা অপরাধবোধ আমাদের থাকে না। এভাবেই...
আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কুকুরের ছবি চিনিয়ে তার কানে ছবি সম্পর্কিত শব্দ হিসাবে তুলে ধরি ডগি।
গ্রীষ্মের অতিপ্রিয় সরস ফল হাতে তুলে বলি, ম্যাঙ্গো খাও। 
আমরা ভাষাকে নস্টালজিয়ায় মেশাতে পারি না বলেই আধো উচ্চারণে কুকুর কে কুকুল বলতে শোনার যে সুখ সেসব ছুঁতে পারি না।
মাতৃভাষা জন্মগতভাবে যোগাযোগের সাবলীল মাধ্যম। অথচ বাঙালী বাবা-মা সন্তানের অর্থবোধক বাক্যের মধ্যে অন্য ভাষার আগ্রাসন প্রকট না হলে নিশ্চিন্ত হতে পারে না তার উন্নয়নের বিষয়ে।
 
যেটুকু মাতৃভাষার প্রতি সচেতনতা আছে সেসবও আমাদের নাক এত বেশি উঁচু করে দিয়েছে যে, আমরা ভাষায় আঞ্চলিকতার প্রভাব কে অস্বীকার করে দুয়ো দিই আঞ্চলিকতাদুষ্ট শব্দবন্ধের প্রতি।
 
আমার ছোটবেলা ভাষাগতভাবে একটা জগাখিচুরি পরিবেশে কেটেছে। বাবার বাড়িতে এদেশীয় গ্রাম্য রীতির সাথে মিলেমিশে লুচি কে নুচি বলা হতো। মামা বাড়িতে খোদ বাংলাদেশের ভাষা এবং যে পাড়ায় আমি থাকতাম সেখানে খেলার মাঠে হিন্দী ছাড়া আর কিছুই প্রায় চলত না। আমি জলের স্বভাবে উল্টোদিকের মানুষের ভাষায় সাবলীল হতে হতে নিজের উচ্চারণশৈলি সম্পর্কে একটা আলাদা পরিচিতি করে নিতে পেরেছিলাম। নির্ভুল বানান এবং স্পষ্ট উচ্চারণের জন্য। ভাষা আর আবেগের একটা মাখামাখি ছিল বলেই আমি মামাবাড়ির উচ্চারণে ওপাড় থেকে নিয়ে আসা ছাপের সাথে মায়ার বাঁধনে বেঁধে আছি আজও।
 
আমাদের সমস্যা হল আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে ভাষার কোনও শিকড় চেনাই না। কোনও মায়ায় বাঁধি না। শুধুমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে আছে ভাষা৷ যেখানে কোনও আন্তরিকতা নেই, নস্টালজিয়া নেই, শুধু কাজ চালিয়ে নেওয়ার ফ্যাকাশে মনোভাব রয়ে গেছে। মাতৃভাষা এখন আর আগ্রহ বা আবেগের সাথে জড়িয়ে নেই বরং অন্য ভাষায় সাবলীল হওয়ায় আমরা স্মার্টনেস খুঁজে পাই। সেইজন্যই হয়ত বিষয় হিসাবেও মাতৃভাষার কদর কমছে।  ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকে নয় চাকরির বাজারের দরের হিসাবে মাতৃভাষা নিয়ে উচ্চ শিক্ষার কথা বিবেচনা করা হয়। 
 
মধ্যবিত্ত মানসিকতার সব থেকে বড় সমস্যা হল তারা নিজেদের বুনিয়াদ সম্পর্কে আগ্রহী তো নয়ই বরং সেটা অস্বীকার করার মধ্যে সুখ খুঁজে পায়। অনেক অভিভাবকদের দেখা যায় তার সন্তান মাতৃভাষা লিখতে-পড়তে পারে না এই কথা কী অবলীলায় গর্বের সাথে বলে চলেন। একটা দেশ,সমাজ,সংস্কৃতি কে গভীরে তলিয়ে জানতে গেলে মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ থাকা জরুরি। 
 
শেষে একটাই কথা বলার, আমরা ছোটবেলায় শিখেছিলাম শিশুর মা যে ভাষায় কথা বলে, তাই তার মাতৃভাষা। আজ যে শিশুকে মাতৃভাষা থেকে দূরে সরানো হচ্ছে, যাকে বোঝানো হচ্ছে মাতৃভাষাকে অস্বীকার করার মধ্যেই কৃতিত্ব আছে সেই শিশু এই শিক্ষায় বেড়ে উঠে যদি কালের নিয়মে তার মা কে অস্বীকার করে তাহলে কিন্তু অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাই না?!
 
 
 
Write comment (0 Comments)