মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় - এর 
একগুচ্ছ কবিতা  

 

জাতক

এখানে কোন সূতিকাগার নেই, শূন্যে ঝুলছে লন্ঠন
প্রসব যন্ত্রণায় কে তুমি আকাশ ফাটাও ?
হা হা করে হেসে উঠছে পৃথিবী
মাথা তুলছে পিতৃত্ব
কে কার লজ্জা  এখন কোথায় লুকোয় ?
ঝিনুকের খোল খুলে বেরিয়ে পড়ছে গোপন সত্য।

 
এখানে কোন সূতিকাগার নেই, অপেক্ষা করছে রমণী
জননী হবার যন্ত্রণা সর্বাঙ্গে মোচড় দেয়
মঙ্গল কলস নেই, ছলকে পড়ে  চোখের জল
ফুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে লাফায় বাঘনখ
পিতৃত্ব লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

 
ভারতীয় অর্থনীতি নতুন জন্মের ঋতুতে
নবজাতকের কান্না কেড়ে তালপাতার বাঁশি বাজায়।

 

শেষ কথা মানুষের জয়

সর্বাঙ্গে ক্ষতচিহ্ন , রক্তে ভিজে আমাদের পাঁজরের হাড় ।
সাঁকো পার হতে গিয়ে দুপায়ে জড়ায় অন্ধকার
ঝনঝন শিকলের শব্দ শোনা যায়।
সুন্দর দিনগুলি হঠাৎ নীলাম হয় চৌরাস্তার মোড়ে
চমকে ওঠে ভয় পেয়ে আমাদের শহর ও গ্রাম ।
বয়স তো ঢের হল মানুষের তবু তারা পরাজয়হীন
ঝড়ের কেশর ছিঁড়ে
বাঘের চোয়ালে রাখে হাত ।
আকাশকে জিতে নিতে দেখায় সাহস
নীলের ফোয়ারা মেখে স্বপ্ন মাখা দিন
অনন্ত যৌবন নিয়ে জলে ও জঙ্গলে চায় নগরপত্তন ।

 
চাঁদ এসে উঁকি মারে আমাদের ঘরের উঠোনে
আন্দোলিত ঘুম
হ্রিদপিন্দে হাতুড়ি পিটে বিদেশির রক্তমাখা হাত
বিশ্বায়ন পাল্টে দেয় জীবনের রঙ
শেওলায় ভরে গেছে সরুপথ অন্দরমহল
স্বপ্ন ছিঁড়ে কে ওড়ায় ঘুড়ি ?
কাদের খেলায় আমরা কাঁচের পুতুল?
কাদের নেশায় আমরা সখের শিকার ?
তিরবিদ্ধ হয়ে গেছি- মুখ থুবড়ে পড়ে আছি ধুলায় ধুলায়
সারা দেশ খুন মাখা ভয়ঙ্কর আরেক চম্বল।

 
কার ফুঁয়ে নিভে গেছে আমাদের যজ্ঞের আগুন?
পূর্ণাহুতি নেই।
কার থাবা ছিঁড়ে নিল আমাদের প্রণয়ের উলু?
ভাসানের স্রোতে ভেসে চলেছে মানসী।
সব সিঁড়ি ভেঙে গেছে , থমকে গেছে সমস্ত উত্থান
চোখের সামনে এক কদর্য পাতাল
ওত পেতে আছে।
মেঘে মেঘে ঢাকা পড়ে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ
ভাষাহীন ফাগুনের বোবা কান্না
ছুঁড়ে দেয় কোকিলের লাশ ।

 
উদাসী হাওয়ায় দুলছে পঞ্চভূত
ক্ষিতি অপ তেজ মরুৎ ব্যোম
জন্মদাগ মুছে ফেলতে বাইজীর নীল নখে শান পড়েছে
মেহফিল খোদার দয়ায়
হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে তৃতীয় দুনিয়া
গ্যালারীতে ডানা কাটা পরী
ঢেলে দিচ্ছে আদিম উল্লাস
শিল্পিত কুসুমগুলি চোরা পথে নিঃশব্দে পাচার
বিকৃত যৌনতা এসে হঠাৎ কি থামিয়ে দিল
উদ্যত লড়াই ?

 
সংগ্রাম স্থগিত হলে কোন ভরসায় পায়ের তলার মাটি
রক্ষা করবে সশস্ত্র দুর্দিনে ?
খাদ্য ও খাদক হাঁটছে হাত ধরাধরি করে একই রাস্তায়
শত্রুমিত্র চেনা বড় দায়
পোশাকের রঙ পাল্টে কে কার পতাকা নিয়ে
ময়দানে দাঁড়ালো ?
ভুল লণ্ঠনের আলো ভৌতিক আলোয়
দুটি চোখ ঝলসে দিয়ে যায়।

 

বয়স তো ঢের হল মানুষের তবু তারা পরাজয়হীন
মাঠ ভেঙে মাটি উল্টায়
বাঘের চোয়ালে রাখে হাত
ঝড়ের কেশর ছিঁড়ে আকাশকে জিতে নিতে দেখায় সাহস
ভাঙনকে রুখে তারা জলে ও জঙ্গলে চায় নগরপত্তন।
সময় পাল্টায় গতি মার খাওয়া মানুষেরা ক্রুদ্ধ বুকে
ফিরে পায় অনন্ত যৌবন
যে যৌবন ঝড়ে জলে উল্কাপাতে ধরে রাখে সৃষ্টির নিশান ।

   

  ধান

একদিন স্বপ্নের জাল বুনেছি একা একা
অথচ জীবনে যৌবনের বীজ বোনা হয়নি পেলব মাটিতে
ভালোবাসার ফসল ঘরে তুলবো বলেই
কৃষকের সহচর আমিও একজন জন্ম-প্রেমিক।

 
ক্ষুধার গল্প আছে বলেই অন্নের কথা সবাই বলে
কিন্তু প্রেমের অর্থ কেউ জানে না
অথচ ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে সৃষ্টির মন্ত্রগুপ্তিও জানতে হয়।

 
রোদ এখন বড়ো চঞ্চল ও দামাল
ছুরির ডগে দু’পা রেখে হাঁটছে অবলীলায়
সেই রোদ নদী হলে জলের অহংকার
ছুঁয়ে ফেলবে মরা-মাটি খরা-মন আধপোড়া যৌবন
নতুন জীবন ঢেউ তুলে তুলে শিল্প ও শস্যের কাছে পৌঁছাবে ।

 
এতদিন শুধু বানানো রূপকথাই শুনেছি
এখন মাঠের বুকে ধানের গান শুনবো
মহাপ্রলয়ের পরেও যে ধান প্রাণের শিকড়ে জলের বাঁশি বাজিয়ে
সুর তুলে
আমরা এখন সেই সুরে সুরে শত সুরের ঝরনায়
জীবনের মন্ত্র শুনতে পাই

 

 ছায়াসঙ্গী

আমি ও আমার ছায়া পাশাপাশি সমান্তরাল
আমার প্রেমিকা জানে তাই কোন চোখমুখে লাজলজ্জা নেই
প্রাণ খুলে কথাবার্তা হয়।

 
আমি ও আমার ছায়া একসঙ্গে থাকলেও
দুজনের মধ্যে কোন বন্ধুত্ব হলো না
ছায়া সে ছায়ার মতো, আমিও আমার মতো আছি
প্রতিবিম্বে দোল খায় ফুটে থাকা ফুল ।

 
প্রতিটি মূহুর্ত যায় ছায়া দেখে আমার মধ্যে শুরু  ক্রমাগত যুদ্ধ তুমুল ।

 

পাথরের কাছে যাই

পাথরের কাছে যাই বুক ভরে ভালোবাসা খুঁজি
পাথর নির্বাক কিছুই শোনে না
পাথরকে পাথর দিয়ে  ঠুকে ঠুকে তাই
আগুন জ্বালাই
এ আগুনে হিমাক্ত শরীর সেঁকে  অগ্নিমন্ত্রে যৌবন রাঙাই ।

 
শব্দহীন ঠোঁটে তার  লেগে আছে চতুর চুম্বন
পাথর জানে না। পাথরের মুখে  কোন ভাষা নেই
ভালোবাসা প্রণয় রোমাঞ্চ  নেই
তবু তাকে ক্ষত ও বিক্ষত করে ছবি আঁকি
নিঃশব্দে ফোটাতে চাই কবিতার ফুল
যে ফুলে গোপন প্রেমে কান্না মাখামাখি।

 
পাথরের কাছে যাই ভালোবাসা খুঁজি
ভালোবাসা সে এক আগুন
ঠুকরে ঠুকরে বের করি তারপর আগুনে আগুনে
অস্ত্র গড়ি, আদিম জীবন নিয়ে খেলা করি
এ খেলায় যুদ্ধ আছে রহস্যময়তা
সেই যুদ্ধ বলে দেয় কোনদিকে  ভালোবাসা কোথায় পূর্ণতা ।

 
পায়ের অনেক নীচে ডুকরে কাঁদে  পাষাণের  কঠিন দস্যুতা।

 

 

Comments powered by CComment

0
1
0
s2sdefault