logo corona

আত্মহত্যা কয়প্রকার ও কী কী
মানস চক্রবর্তী

৩১শে মার্চ ২০২০ থেকে এপ্রিলের ২২ তারিখ পর্যন্ত এদেশে মোট ১২২ জন আত্মহত্যা করেছেন। ভুল লিখলাম লকডাউন কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত এরকম আত্মহত্যার সংখ্যা ১২২। আর কে কে আত্মহত্যা করেছে সে খবর নেই। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স রিপোর্ট করছে ভারতে ডেথরেট আশ্চর্যজনক ভাবে এই এপ্রিলে কম। কত কম? ২১% কম। প্রতিমাসে কতজন মানুষ মারা যান এদেশে? ছাড়ুন প্রতিমাস। এপ্রিল মাসে? ভারতের তথ্য পাবেন না। নিউইয়র্ক টাইমস ঢুঁড়ে দেখেছে পৃথিবীর ১২টা দেশের হিসাব। প্রায় সর্বত্র বেড়েছে মৃত্যুহার। কমেছে এদেশে। কেন? অনেক মত। জাতীয় পরিবহণমন্ত্রী বলছেন গাড়ি চলছে না ফলে রোড অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছে না। রোড অ্যাক্সিডেন্টে সাড়ে বাইশ হাজার মানুষের মধ্যে ৪০৫ জন মারা যান। ২% এরও কম। অথচ মৃত্যু কমেছে ২১%। তাহলে বাকিরা? উত্তরপ্রদেশের এক শ্মশানঘাটের কর্মচারি বলছেন লকডাউন তো মার্ডার কম হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হন ১৫জন। যে খুনের পুলিশ কেস হয়। একমাসে পাঁচশোর কাছাকাছি। গত মাসে কেউ খুন হননি। খুব ভালো কথা। সারা দেশে ৩ হাজারের কাছাকাছি মানুষ খুন হন প্রতিমাসে। মোট মৃত্যুর .০৫%। তাহলে বাকিটা? ওড়িশায় একমাত্র মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। কী বলছেন সেখানকার কর্তাবাবুরা? বলছেন, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ারই কথা। এই সময় রিপোর্ট হওয়া মুশকিল। সব তথ্য ঠিকভাবে একজায়গায় করাও যাচ্ছে না। লকডাউন উঠলে দেখা যাবে সংখ্যাটা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। কী দাঁড়ালো তাহলে!

গত একমাসের লকডাউনে করোনার কারণে মৃতের সংখ্যার দিকে আমরা কড়া নজর রেখেছি, উইকেট পড়ার মতো করে। এরই মধ্যে খবরের কাগজে রিপোর্ট হয়েছে আরও ২১৭জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর। যার মধ্যে ১২২ জন আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশের হাতে খুন হয়েছেন ১০জন। জনধন অ্যাকাউন্টের টাকা তুলতে গিয়ে মারা গেছেন। রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে মারা গেছেন। হাসপাতাল ফিরিয়ে দিয়েছে বলে মারা গেছেন মানুষ। সারা দেশে গড়ে প্রতিমাসে মারা যান সাত লাখ মানুষ। এই এপ্রিলে মোটামুটি সাড়ে পাঁচলাখ। তারমধ্যে হাজারের কাছাকাছি মানুষ মারা গেলেন যাদের স্বাভাবিক অবস্থায় মারা যাবার কথা না। যে স্বাভাবিকতায় আমরা রোজ বাস করি। দুর্ঘটনা, হত্যা, আত্মহত্যা, অসুখ সমেত।

সারা পৃথিবীকে এই মুহূর্তে মৃত্যুভয় গ্রাস করেছে। মহামারির নয় অতিমারি বলা হচ্ছে। মরার ভয়ে আমরা নিজেদের ঘরবন্দী করে ফেলেছি। যারা ঘরে থাকতে চাইছে না, তাদের পুলিশ ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ঘরে ঢোকাতে গিয়ে এমনকি মেরেও ফেলছে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন আমাদের আপাতত এইভাবেই চলতে হবে। মাস্ক পরতে হবে জাঙিয়া ব্লাউজের মতো। মাস্ককে আমরা এবার পরিধেয় বলে মান্যতা দেব। মানুষ আর মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। ঝাঁপিয়ে একমাত্র পড়তে পারে মারধোর করতে হলে। ভালোবেসে জড়িয়ে ধরা হবে না আর কাউকে। মৃত্যুভয় আমাদের সে দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। এরকম হওয়াটা ঠিক হচ্ছে না কি অন্যায়?

জানি না। কী হচ্ছে চাদ্দিকে? পেট্রোলের স্টক নিয়ে বাওয়াল হচ্ছে। ইস্রায়েল ইউএস থেকে ভারত অস্ত্র কিনছে। আর কি হচ্ছে জিওর সঙ্গে ফেসবুক চুক্তি করছে রিটেল ব্যাবসা করার জন্য। ফ্লিপকার্ট অ্যামাজন আবেদন করছে সমস্ত পন্য বিক্রি করার জন্য। খবর হচ্ছে এই অক্টোবরেই চলে আসবে ভ্যাক্সিন। জানা যাচ্ছে নিউজ চ্যানেল আর অনলাইন এন্টারটেনমেন্ট মিডিয়ার ব্যবসা বেড়েছে ৪%।

আর কী হচ্ছে? সরকার ৮০কোটি গরিব মানুষের জন্য খরচ করবে বলেছে ১৭০০ কোটি টাকা। যার মধ্যে গতবাজেটে ঘোষিত খরচের অনেকটাই ঢুকে আছে। আর? সারা দেশে ৫৮৯টা কোভিড হসপিটাল যাতে ১১হাজার আইসিইউ বেড। এই ৫৮৯টি হসপিটাল নতুন তৈরি হয়নি। আগেই ছিল। মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন কিছু যোগ হয়নি। ছাড়ুন কী হয়নি সে কথা বলতে বসিনি। বলছি কী হয়েছে। তো আর কী হয়েছে? ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কেন? কেননা এরা রপ্তানি যোগ্য পন্য উৎপাদন করে। আপনি জানেন এমন ছোট কিংবা মাঝারি শিল্পের কথা? আমাদের নজরে যা বিরাট সরকারের নজরে তা ছোট। এই সূত্রটা না জানা থাকলে কোনো হিসাবই মিলবে না। যেমন আমাদের নজরে যিনি সম্ভ্রান্ত কৃষক, সরকারের নজরে তিনিই ক্ষুদ্র চাষী। যাকগে, আর কী হচ্ছে? ধনখড় টুইট করছেন চিঠি লিখছেন, মমতা পত্রাঘাত করছেন। দিলীপ ঘোষ এই বলছেন মমতা ওই বলছেন। ট্রাম্প হুঙ্কার দিচ্ছে। মোদি ল্যাজ গুটোচ্ছে। চীন টাকা দিচ্ছে। জার্মানি কিট দিচ্ছে। তুর্কমেনিস্তান করোনা বললেই ভরে দিচ্ছে, টেস্ট তো দূর অস্ত। আর কী হচ্ছে?

আপনার বাড়ির পাশে অথবা আপনি নিজেই দুরুদুরু বুকে দোকান খুলছেন, মাঠে গিয়ে তিল নিড়ুচ্ছেন, শশামাচা ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। কারখানার মালিক আপনাকে বলে দিয়েছে কাজ করতে চাইলে এসো কিন্তু নিজের দায়িত্বে। পুলিশ কিছু বললে আমরা জানি না। আপনি পেটের দায়ে বেরিয়ে পড়ছেন। আপনার মরা চলবে না। আপনার খুব একটা ক্ষতি হবার নেই ধরেই নেওয়া হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছ বলেই সারে ভর্তুকি কমে গেল আবারও, এই লকডাউনের মধ্যেই। আপনাকে একজন বলছে দোকান খোলো, আর একজন বলছে বন্ধ করো। আপনি তৃণমূল কিংবা বিজেপির দিকে ঢলে পড়ছেন। হয়ত একদুজন ভাবছেন সিপিএমই ভালো ছিল। এইভাবে আপনি দুলছেনই কেবল। আর দুলতে দুলতে, আমাদের দেশে শোনা যাচ্ছে ১২২ জন এইমাসে ঝুলে পড়েছেন। শেষ করে দিয়েছেন সমস্ত টেনসান। বিষ খেয়ে নিয়েছেন। ঝাঁপ দিয়েছেন উঁচু ছাদ থেকে। নিস্তার পেতে চেয়েছেন।

এই একশ বাইশ জনের পাশে বসে আমাদের দেশটাকে দেখতে ইচ্ছে করছে আমার। আপনারও যদি ইচ্ছে করে চেষ্টা করা যাবে অন্তত কয়েকজনের সঙ্গে যদি কাটানো যায় কিছুটা সময়।

Comments powered by CComment