logo corona

আজকের দিনে 

ডাঃ নীলাঞ্জন ষণ্ণিগ্রহী 
 
একটা কথা আজ বলতেই হবে। অনেকেই হয়তো বলবেন যে এটা সময় নয় এসব কথা বলার তবু আজ এই কথাটা বলা দরকার। এখন অনেকেই দেখছি ডাক্তার দের ভগবান টগবান বলতে শুরু করেছেন। অনেকে বলছেন যে আমরা চিরকাল ই ডাক্তারদের ভগবান মানি। সেটা আপনাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমরা ডাক্তাররা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ। ভগবান কাকে বলে আমরা জানি না। ভগবান হওয়ার কোন ইচ্ছেও আমাদের নেই। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকি, আর সেই ভাবেই থাকতে চাই। 
এই করোনা মোকাবিলায় যাঁরা সবচেয়ে সামনে এসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের ডাক্তার সমাজে একটা তকমা আছে। এঁদেরকে বলা হয় জুনিয়র ডাক্তার। অর্থাৎ ইন্টার্ন, হাউসস্টাফ, আর পিজিটি রা অর্থাৎ যাঁরা এম ডি, এম এস করছেন। এঁরাও কোন না কোন পরিবারের সন্তান। কেউ কেউ বা বাবা মা এর একমাত্র সন্তান। যেমন বাবা মা এর একমাত্র সন্তান যদি দেশ প্রতিরক্ষায় যোগ দেন, তাহলে তাঁদের ভেতরে যা হয় আজ হাজার হাজার জুনিয়র ডাক্তারের বাবা মা এর ভেতর তাই হচ্ছে। বিশ্বাস করুন এঁরা কেউ ভগবান নন। 
এঁরা সবাই মাটির মানুষ। আবার বলছি। হাতজোড় করে বলছি দয়াকরে আমাদের ভগবান বলবেন না। খুব যদি সম্মান করার ইচ্ছে হয় তাহলে ভাই বা দাদা বললেই সম্মানিত হব। মনে রাখবেন কোন রক্ত মাংসের মানুষকে ভগবান বলা অন্যায়। ভগবান পরম করুণাময়। তিনি আছেন না নেই তা নাস্তিক আর আস্তিকের বিতর্কের বিষয়। কিন্তু যদি সত্যিই আপনি আপনার ডাক্তার ভাই বা দাদাটির ভালো চান, তাঁকে সম্মান করতে চান তাহলে দয়া করে অপ্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে বেরোবেন না।
আপাতত আমাদের হাতে এই ভাইরাসের  কোন ভ্যাক্সিন নেই। তাই এই ভাইরাসকে ঠেকিয়ে রাখতেই হবে। এই ভাইরাসটিকে আমরা করোনা ভাইরাস নামে চিনি, আসলে করোনা ভাইরাস অনেক আগে থেকেই আছে। এর আগে SARS হয়েছে। এই ভাইরাসটির আসল নাম SARS COV 2 .যাকে আমরা COVID 19 নামে ডাকছি। এটি একটি নতুন ধরণের করোনা ভাইরাস তাই এর ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করা সময় সাপেক্ষ। তাই যতদিন না ভ্যাক্সিন হাতে পাওয়া যাচ্ছে ততদিন কম বেশী লক ডাউন এ আমাদের থাকতেই হবে, আর পারস্পরিক দূরত্ব বজায়, বাইরে বেরোলেই মাস্ক পরা এবং সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা এগুলো মেনে চলতেই হবে, এখন দীর্ঘদিন। 
আমরা সবাই জানি লক ডাউন এর ফলে বহু মানুষ আর্থ সামাজিক ভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক মানুষ বাড়ীতে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠছেন। কিন্তু যত কষ্ট ই হোক এ লড়াই টা লড়তেই হবে। কারণ আমরা সবাই মিলে এটা লড়ছি। এটা কারোর একার লড়াই নয়, একটা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সমগ্র মানবজাতির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে সৈনিকের মৃত্যু হবেই। যুদ্ধের তাই নিয়ম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াইটা আমাদেরই জিততে হবে।
মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে, কলেরা, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, গুটি বসন্ত, ক্যানসার, এইডস, এসবের বিরুদ্ধে মানুষ যুদ্ধ করে বেঁচে ছিল এবং আছে। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও মানুষ বেঁচে থাকবে। তাই ভয় নয়। এই মৃত্যুর মুখেও আনন্দে থাকতে হবে। আনন্দে বাঁচতে হবে। শত বাধার মধ্যে বিপত্তির মধ্যে আনন্দে বাঁচাই জীবন। শুধু করোনা নয়, দুর্ঘটনা, অজানা রোগ, হঠাৎ করে মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু তা বলে কি আপনি ভয়ে ভয়ে জীবন কাটাবেন, অমন জীবন কাটিয়ে কী লাভ? 
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যুদ্ধ যখন অবশ্যম্ভাবী, হত্যাই যখন ধর্ম, হৃষ্টচিত্তে, বীর যোদ্ধার মত তখন কর্তব্য পালন করা উচিৎ। জগতে প্রতিটি মহামানব মৃত্যুর মুখেও মানুষকে আনন্দে বাঁচতে শিখিয়েছেন। আজ সবচেয়ে বেশী মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা। করোনার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ের অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ছি। সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, যাঁরা সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের প্রণাম। এই মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যাঁরা আনন্দের গান করছেন তাঁদের প্রণাম। 
আর যাঁরা মৃত্যু ভয়ে ভীত, এখনো অন্যের নিন্দা পরচর্চা, থেকে বেরোতে পারেন নি, তাঁদেরকে জানাই, কদিনের জীবন? একটু আনন্দে বেঁচে নিই চলুন। যে কটা মুহূর্ত হাতে আছে। 
করোনাকে নিয়ে আর ভয়ের কথা নয়, ওকে আমরা ভয় পাইনা। সচেতনতাই আমাদের নির্ভয়তা। আমাদের প্রকৃত নির্ভরতাও। 
আজ সবার আগে নিজের কথা ভাবুন, নিজেকে সুস্থ রাখুন, তাহলেই করোনা হেরে যাবে। 
নিজেকে ভালোবাসা, নিজেকে সুস্থ রাখা, নিজেকে রোগমুক্ত রাখাই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষ বিপদে পড়েছে, ঘরে বসে তাদের জন্য বুক চাপড়ে কাঁদে মূর্খ। প্রতিবেশী বিপদে পড়লে এগিয়ে যায় প্রকৃত মানব। আসুন আমরা সবাই নিজে সচেতন হই, আমাদের প্রতিবেশীদের সচেতন করি, ধমকে নয়, ভালোবেসে, প্রেমে। ভারতবর্ষের মানুষকে দেখে চমকে উঠেছি কয়েকদিনে। এ কদিনে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে বহুগুন। ভারতবর্ষের মানুষ যে এতটা স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠতে পারে কখনো কল্পনাও করিনি। যে টুকু অসচেতনতা আছে চলুন আমরা পরম প্রেমে মানুষ কে বোঝাই। তবে অবশ্যই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে। পুতুল ঈশ্বরের পায়ে মাথা না খুঁড়ে, মানব ঈশ্বরের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে আবেদন করি চলুন, প্রার্থনা করি চলুন, হে মানবাত্মা নিজেকে প্রেম দাও, নিজে সচেতন হও। নিজেকে ভালোবাসতে পারাই জগতকে ভালোবাসার প্রথম পদক্ষেপ। 
আর কবিদের, লেখকদের, প্রতি অনুরোধ যত পারেন নতুন সৃষ্টি করুন যেন মানুষ আনন্দ পায়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আনন্দের, জীবনের জয়গান যে গাইতে পারে, সেই প্রকৃত মানব। 
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নির্ভয়ে থাকুন, নির্ভয়ে বলুন " তবু যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে এ পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। "
আমরা আছি সবাই সবার পাশে, আর থাকবোও অনন্ত মৃত্যুহীন জীবন প্রবাহে।।

Comments powered by CComment