• IMG-20180311-WA0016-copy.jpg


আমাদের কথা

আমাদের শরীরে লেপটে আছে আদিগন্ত কবিতা কলঙ্ক । অনেকটা প্রেমের মতো । কাঁপতে কাঁপতে একদিন সে প্রেরণা হয়ে যায়। রহস্যময় আমাদের অক্ষর ঐতিহ্য। নির্মাণেই তার মুক্তি। আত্মার স্বাদ...

কিছুই তো নয় ওহে, মাঝে মাঝে লালমাটি...মাঝে মাঝে নিয়নের আলো স্তম্ভিত করে রাখে আখরের আয়োজনগুলি । এদের যেকোনও নামে ডাকা যেতে পারে । আজ না হয় ডাকলে মহুল...মহুল...

ছাপা আর ওয়েবের মাঝে ক্লিক বসে আছে। আঙুলে ছোঁয়াও তুমি কবিতার ঘ্রাণ...



প্রচ্ছদ - সৌমেন মাজী       
Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault

 

ম্পা দ কী

মন...
যখন আছে। তার কেমনও আছে...

হুস করে বাতাস নিয়ে গেল তোমার গন্ধ।
কেউ পাচ্ছে কোথাও...। একবার ভাবো!

অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো যে!
যাবো?
উঁহু, যাবো না।
অমনি মন কেমন কেমন করে উঠছে তো?

যে বাউল চলে গেল এইমাত্র, গানের শেষ কথাগুলো নিয়ে গুনগুন গাইছে তোমার মন...

শিউলি ফুটছে। কাশ ঝরছে কোথাও।
অপু দুর্গার চোখে মনকেমনের আকাশ!

হাহাকারগুলো ফুটে আছে মাটিতে,
বৃষ্টি কতটুকুই বা ধুতে পারে!

তবু এই যে বেঁচে থাকা,
মনকেমন আছে বলেই না?
 
মহালয়া ২০১৯                   --- কেশব মেট্যা
                 
           
Write comment (0 Comments)
0
1
0
s2sdefault
 

কালো মানুষ ভালো মানুষ
অ্যাঞ্জেলিকা ভট্টাচার্য  

 টগবগ টগবগ ঘোড়া ছুটছে। টাঙ্গা নয়। ঘোড়ায় টানা ঠ্যালা গাড়ি। রানীর মতো বসে আছে মাঝ বয়েসি এক মহিলা। আমার চেনা কয়লাওয়ালি। ঝাড়খণ্ড ঘেঁষা শহরে এভাবেই জীবিকার সন্ধানে এসে পড়ে কত বিচিত্র মানুষ ।

কয়লাওয়ালি , ও কয়লাওয়ালি তোমার বস্তায় কী আছে ?

কয়লাওয়ালি মিচকি হাসে। ভাঙা বাংলায় বলে – খোঁকি কইলা  আছে। দেখো মেরা শাড়ি , হাত পা সব কালা হয়ে গেছে।

কাবুলিওয়ালা সিনেমার ছবি বিশ্বাস কে দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। তার খোঁকি ডাক শুনতে ভালোলাগে । কাবুলিওয়ালার শরীর থেকে পাঠান বংশের বেক্তিত্ব ঝড়ে পরে। কিন্তু কয়লাওয়ালির সাদামাটা বেঁটে খাটো চেহারায় কোন আভিজাত্য নেই। তার গায়ের রঙ মিশকালো। নাকের উপর একটা বড় নাকছাবি। মাথায় বড় টিপ। সিঁথিতে কমলা রঙের সিঁদুর। তার পোশাকআশাক  থেকে তার জীবিকা ধরা পরে। তার কী নাম কেউ জিজ্ঞেস করে না। বললেও কারোর মনে থাকে না। সবাই তাকে কয়লাওয়ালি বলে চেনে।  

মাইজি ফ্যানের হাওয়া নাই! খুব গরমি। গাঁয়ের আঁচল দিয়ে হাওয়া করতে থাকে কয়লাওয়ালি।  

পিছন থেকে মায়ের গলা পেলাম – এই গণগণে রোদে বেরিয়েছ কেন ? বাইরে লু দিচ্ছে। এই নাও আম পোড়া শরবৎ খাও। শরীর ঠাণ্ডা হবে। তোমার ঘোড়া গাড়ি তার চালক সব  কোথায় গেল?

  • সে এগিয়ে গেল। ঘোড়াটাকে দানা জল খাওয়াবে । হামি ইখানে ঢুকে পড়লাম। বাপরে বহুত গরমি। 

মা ফ্যানের রেগুলেটার অনেকবার ঘোরালো। কিন্তু স্পীড যা ছিল তাই রয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে বলল – এই দুপুর বেলাটায় ভোল্টেজ একটু ডাউন থাকে। সবার বাড়িতে ফ্রিজ , টিভি, পাম্প বসেছে। কত আর টানবে? তাই পাওয়ারের আপডাউন লেগেই থাকে। আসলে আমাদের বাড়িতে ফ্রিজ , পাম্প এসব কিছুই ছিল না। একমাত্র একটা সাদাকালো টিভি ছিল।  

কয়লাওয়ালি কিছুই বুঝল না বা হয়ত বুঝল। ঢকঢক করে শরবৎ খেয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়ল – মাইজি তোর ঘরে এসে বড় শান্তিলাগে। সেই ভাড়া ঘর  থেকে আমি আসছে ।নিজের হাত গুনে গুনে কী ভেবে নিয়ে বলল – দেখতে দেখতে বিশ সাল  নিকল গিয়া!  আমার দিকে তাকিয়ে বলল – তুই তখন ছিলিস না খোঁকি। তোর দিদি দাদা তারপর , বড় ঢেকুর তুলে বলল -  তুই তো এই সেদিন হলি ।

এই কথাটা বললে আমার রাগই হয়। এই সেদিন হলাম! এখন আমি এগারো  বছরের। আমি কোন উত্তর দিলাম না।তাতে কয়লাওয়ালির কিছু যায় আসে না। সে মায়ের সঙ্গে কথা বলে চলেছে - তব তু কইলাতে রান্না করতিস। গ্যাস কিউ লিয়া ?

মায়ের সবসময় হাত চলে। উল কাটা বুনতে  বুনতে বলল – রান্না তাড়াতাড়ি হয়। অনেক সুবিধা। উননের ধোয়াতে ঘর নষ্ট হয়ে যায়। এখানে তো দুটো ঘর এক চিলতে উঠোন। বাড়ি গুলো ঘিঞ্জি। কারোর বাড়িতে একটু ধোঁয়া ঢুকলেই চিৎকার করে।

কয়লাওয়ালি মাথা দোলায় – হাঁ বহত সুবিধা। মাইজি এখন কেউ আর কইলা নেয়না। কইলা না নিলে আমরা তো মরে যাবো।

সত্যি আমাদের বাড়িতে কয়লার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কয়লাওয়ালির কথা শুনে মা মাঝে মাঝে কয়লা রাখত। তার ব্যবহার হত পাড়ার দুর্গা পূজাতে  নয়ত কালী পুজোয়।তখন মাটির বড় উননে গণগণ করে আঁচ ওঠার জন্য ফুল কয়লার দরকার পড়ত ।

 তখন কলেজে আমি। একদিন কয়লাওয়ালি দুপুর বেলায় তার ভাই , দাদা সবাইকে নিয়ে হাজির। সেবার একটু রাগ হয়েছিল। হুট করে বলা কওয়া  নেই। একেবারে প্রায় ন দশজন লোক এসে হাজির। কয়লাওয়ালি তার আত্মীয়দের দেখাতে এসেছে যে  এই অপরিচিত বিদেশ বিভূঁইয়ে তার আপনজন মাইজি তার বহুত খেয়াল রাখে।আমাদের তখন দোতালাটা নতুন। বেশ সাজানো গোছান। সবাই বেশ ঘুরে ঘুরে দেখে তাদের দেশের ভাষায় কিছু বলছিল। তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু খুব খুশি এটুকু বোঝা যাচ্ছিল। অন্যের সুখ দেখে খুব কম মানুষ সুখী হতে পারে । এই গুনটা অনেক শিক্ষিত মানুষেরও থাকে না।  

কয়লাওয়ালির খেয়াল রাখার মধ্যে মাঝে সাঝে এলে রুটি নয় ভাত বাঁধা ছিল তার। আপদে বিপদে টাকা ধার দিয়েছে মা। মা কে এতোটাই ভরসা করত যে মায়ের কাছে তার সঞ্চিত অর্থ রেখে যেত। বলত – দেশে যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো।

মায়ের কাছে শুনেছিলাম। দেশে শ্বশুরবাড়িতে তার সতীন আছে। কয়লাওয়ালির কোনোদিন কোন সন্তান হয়নি। তাই স্বামী আবার বিয়ে করেছে। সতীনের চারছেলে। দেশে গেলে তাদের হাতেও কিছু টাকা দিয়ে আসে। ভাইদের সংসারে টাকা দেয়।

টাকার অনেকগুন। টাকার জন্য তার কদর বজায় থাকে। দিদিকে নিয়ে আসার জন্য দেশ থেকে তার ভাইও চলে আসে।

কয়লাওয়ালি যে কোথায় থাকতো তার ঠিকানা  কোনোদিন জানার আগ্রহ হয়নি ।হঠাৎ করেই গায়েব হয়ে গেল যেন। বহুদিন আসে না। এর মধ্যে আমার বিয়ে হল। অষ্টমঙ্গলার দিন বাড়ি গিয়েছি। সেই চেনা ডাক সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। মাইজি , মাইজি। আমি সামনে আসতেই আমায় দেখে অবাক না হয়ে একগাল হেসে বলল – খোঁকি তোর  শাদী হোগিয়া !  বহুত সুন্দর লাগছিস। হাতে গুজে দিয়েছিল পঞ্চাশ টাকা।

তারপর মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষন কথা বলল। সে দেশে পড়ে  গিয়ে খুব চোট পেয়েছিল। ওখানেই  এতদিন ছিল। এই বয়েসে বোঝ হয়ে থাকতে ভাললাগে না তার । সেসব বলে গেল। এটাও বোঝা গেল তার টাকা এখন শেষ। তাই আপনজনদের কাছে তার কদর ফুরিয়েছে।  

সেদিন উপহারের পঞ্চাশ টাকা আমার কাছে কেমন অমুল্য হয়ে উঠেছিল। আমি কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিলাম মানুষটার দিকে।রুগ্ন , বয়েসের ভারে নুইয়ে পরা  ভাঙাচোরা একটা দেহ নিয়ে ঘষটে ঘষটে সিঁড়ি দিয়ে যখন নেমে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল বিজ্ঞান আমাদের  আধুনিকতা দিয়েছে। সময় বাঁচিয়ে আমারা সভ্যতার দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে চলেছি। কিন্তু এই সভ্যতার অলিতে গলিতে মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

ব্যল্কনিতে ছুটে এসে দেখেছিলাম সেদিন তার কয়লার ঠ্যালা নেই। জিজ্ঞেস করলাম – তোমার ঘোড়া কোথায় ? ঠ্যালা  নেই ?

নিচ থেকে উপর দিকে তাকাল। হেসে বলল – কইলা কয়ি নেহিলেতা বাবু। তো ঠ্যালা দিয়ে কী করবো ?ঘোড়াটাও মরে গেছে। পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল – এহি মেরা গাড়ি হ্যাঁয়। বুঝলাম এখন সে কয়লা বেঁচে না। কিন্তু কি করে চলে তার এখন জিজ্ঞেস করা হল না। সে এগারো নম্বর গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে গলির মুখে হারিয়ে গেল।

সেই শেষবার দেখা হয়েছিল। আর কোনোদিন কয়লাওয়ালির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি ।শুনেছিলাম পুরনিয়াতে তার দেশ। সেখানেই শ্বশুর বাড়ি , বাপের বাড়ি।

এবার গরমে উত্তরবঙ্গ থেকে ফেরার পথে ট্রেনের টিকিট কনফার্ম হয়নি। তাই গাড়িতে ফিরছি। ডালখোলা থেকে রাস্তা ভুল করে বিহারের পুরনিয়ার  দিকে চলে এসেছিল ড্রাইভার। একজনকে জিজ্ঞেস করে আবার ফেরার পথ ধরি। প্রায় সত্তর কিলোমিটার পিছনে ফিরতে হবে। জানলার ধারে বসে গরম হাওয়া আর রোদ খাচ্ছি। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলছে কিন্তু তার তাপ কমেনি। রাস্তার ধারে দাঁড়ানো হয়েছে চা খাবো। হঠাৎ খেয়াল হল মস্ত গাছের নিচে খাটিয়ায় একজন বৃদ্ধা শুয়ে আছে। মুখে অজস্র বলি রেখা। কুঁকড়ে যাওয়া শরীর। মুখটা চেনা। কোথায় দেখেছি। মনে করতে পারলাম না।

মধ্যরাত এখন ফারাক্কা ব্রিজ ক্রস করে এসেছি। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটছে। ঝিমুনি এসেছিল। হঠাৎ নিজের অজান্তেই চমকে উঠেছিলাম। কয়লাওয়ালির মুখটা ভেসে উঠল। আজকের ওই খাটিয়ায় শোয়া জীর্ণ ভদ্রমহিলা কী সেই আমার দেখা পনের বছর আগের হাসিখুশি কয়লাওয়ালি !  সাদৃশ্য খুঁজতে খুঁজতে বিনিদ্র রাত্রি কাটিয়ে কখন দুর্গাপুর  হাইওয়ে ধরে নিয়েছি। অন্ডাল রোড ঢুকতেই দেখলাম রাস্তার একপাশে  কয়লার ওভার লোডেড ডাম্পার দৈত্যর মতো দাঁড়িয়ে আছে সারসার দিয়ে। দৈত্যগুলোর কোন ঘোড়া নেই।

Comments powered by CComment

0
1
0
s2sdefault