logo corona

বিশ্বমারী করোনা ও পরবর্তী ট্রমাকথা
বিভাবসু 
বিশ্বমারী করোনা নিয়ে আবিশ্ব চিন্তিত। লড়াই জারি পুরোদমে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলা চলে। আমরা জানি একদিন এই ঝড় থেমে যাবে। এও জানি এই ঝড়ের ক্ষত থেকে যাবে অনেকদিন। বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বসে পড়বে। বিশ্বরাজনীতির প্যাটার্ন বদলাবে। কিন্তু সভ্যতা নিজের মতো করে আবার উঠে দাঁড়াবে। দাঁড়াবে কি? না, নিরাশাবাদী আমি নই। প্রাকৃতিক অবস্থা স্বাভাবিক না হলে, আশাবাদী হয়েও লাভ নেই অবশ্য। তবু আশা করি পৃথিবী স্বাভাবিক হবেই। 
করোনা বিষয়ে বর্তমান সমাজ ঠুঁটো জগন্নাথ সদৃশ। বোঝাই যাচ্ছে, উন্নত, অনুন্নত সব বিশ্বের সামাজিক-সাংস্কৃতিক চটকদারী আসলে 'কাগুজে বাঘ'।  তৃতীয়শ্রেণির মেধার এইরকম চটকদারী, লোক-দেখানি থাকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তা অন্তঃসারশূন্য। মাকালফল যেমন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মুক্তধারা' নাটকে আমরা পেয়েছিলাম যন্ত্ররাজ বিভূতিকে। সে ঝরনার উপর আকাশচুম্বী এক বাঁধ গড়ে তুলেছে। এই দাম্ভিক নির্মাণের পেছনে রয়েছে মানুষকে ভয় দেখনো, তাদের জব্দ করা। কিন্তু বাঁধের ভেতরে যে একটা দুর্বলতা আছে, তা সে নিরাময় করতে পারেনি। সে পারেনি কারণ এই নকশাটা চুরি করা। তৃতীয় শ্রেণির এই বুদ্ধিমান এই বাঁধের নকশা চুরি করেছে তাঁর বুদ্ধিমান গুর বেঙ্কটবর্মার কাছ থেকে। বেঙ্কটবর্মা মানব অকল্যাণকর এই বাঁধ নির্মাণ করতে চায়নি বলে, তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভদ্রলোক না খেতে পেয়ে মারাই গেছেন। অথচ সেই 'পরের ধনে পোদ্দারি' করছে বিভূতি। সে রাজার কর্তাভজা। এরাই মানব সভ্যতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। ফলে পরিস্থিতি কতটা কী স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে চিন্তা আছে। 
ফলে মঙ্গলে পৌঁছে যাওয়া বর্তমান পৃথিবী, মাথা কুটেও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারছে না। যখন পারবে ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আবার বিজ্ঞান যতক্ষণ ওষুধ আবিষ্কার করে না উঠছে, ঐশীবাদীরা আকাশের মাহাত্ম্যও কিছু ঘোষণা করতে পারছে না। তারা গোচোনা বা অন্য কিছু খাচ্ছে বটে, কিন্তু  শঙ্কা কাটাতে পারছে না। সুপ্রিমের ইশারায় তাদের আস্থা নড়বড়ে হচ্ছে। (আদৌ হচ্ছে কি?)। মৃত্যুভয়ে তারা বেশি শঙ্কিত। আমি ফেসবুক-মেসেঞ্জারে, হটসঅ্যাপ-ফোনে এই জাতীয় মানুষদের এবং স্বনামধন্য অসৎ ব্যক্তিদের মৃত্যুভয়ে তটস্থ হতে দেখছি। অবশ্য এদের এই মৃত্যুভয় নিয়ে কিছু বলার নেই। এই সমস্ত সাধু এবং অসাধুরাই পৃথিবীর অধিকাংশ দুরবস্থার  জন্য দায়ী। এরাই ছেলেমেয়েদের উপদেশ দেয়—'পারলে বিদেশে যাও, এদেশে থাকলে কিচ্ছু হবে না।' আবার বিদেশে গিয়ে 'করোনা' বাধিয়ে এলে তাকে 'গণশত্রু' ঘোষণা করে। এর আগে বিদেশি ডলারগুলোর দিকে এরাই জুলুজুলু করে তাকিয়েছে। 
বোঝা যাচ্ছে এঁরা সুযোগসন্ধানী এবং অন্তঃসারশূন্য। এদের কথায় গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই। চিনের দ্রব্যছাড়া যাদের একমুহূর্ত চলে না তারা চিনের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইংল্যান্ডের রাজপুত্র করোনাক্রান্ত হলে এদের প্রভুভক্ত লেজ এখনও নড়ে ওঠে। এরা যদি ট্রমাগ্রস্ত না হয়, তবে কারা হবে। নিজেদের কিছু করার নেই যাদের, হয় তারা বিদেশের, নয় আকাশের কৃপাপার্থী হবে আর মাঝে মাঝে কত্তাল বাজাবে বা করজোড় করবে। ফলে এদের আতঙ্কিত হওয়া নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। 
কিন্তু আজ সকাল বেলায় একটা ফোন আমাকে চিন্তিত করে তুলল। আমাদের সরকার যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েছেন, বোঝাই যাচ্ছে তা একমাত্র এবং অনিবার্য পথ। এতে যথারীতি চিন্তা বা বুদ্ধিমত্তার  বা অভিনবত্বের কোনো ছাপ নেই। আগেই বলেছি এই সমাজ তৃতীয়শ্রেণির মেধাকে প্রশ্রয় দেয় এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত হয়। সমূহসঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে পারতেন যে ভেঙ্কটেশেরা, তাদের এরা দায়িত্ব নিয়ে তাড়িয়েছে। আজ সমাজ পরিচালনা করছে এই জাতীয়  বিভূতিরা। ফলে জীবাণুনাশক রাসায়নিক দিয়ে মানুষকে তারাই 'শোধন' করতে পারে। লকডাউনের সময়ে সাধারণ মানুষ কীভাবে বাঁচবে, আটকে পড়া মানুষেরা কীভাবে পৌঁছুবে ঘরে, তার কিছুই পরিকল্পনা না করে, তালাবন্ধ ঘোষণা করতে, খুব একটা বুদ্ধির প্রয়োজন হয় বলে আমারতো মনে হয় না। 
যে কয়েকজন বিরলপ্রজাতির গুণি মানুষ এখনও আছেন, আমার বন্ধু তাঁদের মধ্যে একজন। বুদ্ধিমান, ভাবুক এবং ধীরস্থির। কোনো বিষয়ে তাঁকে আমি উতলা হতে দেখিনি। খুবই ব্যস্ত মানুষ।  তাঁকে ফোনে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। এই একাকীত্বের বাজারে তিনি আমাকে ফোন করেছেন! অবাকই হলাম। কুশল বিনিময়ের পরে তিনি বললেন মানবতার এ কী হাল হল? গরীব বলে তাদের ওইভাবে ধোয়াতে হবে? আমি আর নিতে পারছি না। কী আর উত্তর দেবো!  বললাম, কিছু লিখছো? বললেন চেষ্টা করছি। কিন্তু  এগুতে পারছি না। এত দুশ্চিন্তা হচ্ছে, তোমাকে কী বলবো। 
বন্ধু ফোন রাখার পর থেকে, আমার মাথায় বিষয়টি ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে লাগলো। আমি ভেবে দেখলাম করোনা ভাইরাসজাত রোগটা একদিন বন্ধ হবে। ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হলেও, সবার প্রচেষ্টায় একদিন এমনিতেই মিলিয়ে যাবে। কিন্তু মানবসভ্যতার মধ্যে এই কয়দিনে যে ট্রমা তৈরি করবে তা ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। পারে না হবে। বিগত মন্বন্তরগুলির ট্রমা থেকে আমরা এখনও বেরিয়ে আসতে পারিনি। তথাকথিত উন্নত বিজ্ঞান ও পরিচালন ব্যবস্থার পরেও, মানব সভ্যতাকে যতটা ভ্যাবাচ্যাকা খেতে দেখছি, তাতে আমার আশঙ্কা হচ্ছে এই আতঙ্কটা আমাদের মধ্যে রোগ হয়ে না ওঠে। মজা, ইয়ার্কির পথ ছেড়ে সে ইতিমধ্যে গম্ভীর উদ্বেগের দেশে চলে এসেছে।  মিডিয়াগুলি এই আতঙ্কের প্রধান বাহক। আমার বন্ধুর মত বিচারশীল মানুষও একটু  একটু নড়তে শুরু করেছেন। 
 
তাই আমার মনে হয়েছে করোনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা যেমন জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি মানুষকে করোনা পরবর্তী ট্রমা থেকে বের করে আনা। তা না হলে নানা মনোরোগ সমাজের মধ্যে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পরতে পারে। সারা পৃথিবীতেই আজ বেশি বেশি ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে।

Comments powered by CComment