Author

Somnath Sharma ।। সোমনাথ শর্মা

omnath heontor mohool

আমাদের রবীন্দ্রনাথ
সোমনাথ শর্মা

রবীন্দ্রনাথ। এই ভদ্রলোক সম্পর্কে আমাকে লিখতে হবে! কঠিন কাজ। ও কাজ আমি করব না। আমি যাদের চিনি তাদের নিয়ে লিখব। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কত ভালোবাসি তার সপ্রমাণ ব্যাখ্যায় যাব খানিকটা।

একজন লেখক বা যে কোনো পেশার সৎ লোক মনীষী হয়ে ওঠেন তাঁর চিন্তা –মেধা –প্রজ্ঞা দিয়ে। এখন মনীষী হয়ে উঠলেন, উঠে ঝামেলা বাড়ালেন আমাদের জীবনে! গাদা গাদা গান লিখলেন- সে সবের বেশ কিছু শেষ দশ বছর ট্র্যাফিকে বাজছে, যাদের জন্যে বাজানো- সেই সো কল্ড জন(অ)সাধারণের জন্যই বাজারে কম পয়সায় রবীন্দ্ররচনাবলী সুলভ। পয়সাও লাগে না- পাবজি খেলার ফাঁকে রবীন্দ্রনাথ যা যা লিখেছেন , এমনকি যা লেখেননি- সবের পিডিএফ পাওয়া যায় বিনে পয়সায়! কথা হচ্ছে এত সব পড়বে কে- মহাপুরুষের চারুপ্রকাশ ঘোষের মত বলতে হয় ! পড়বেই না কেন ! বাংলাবাজারে- (হ্যাঁ এই বাংলাবাজার হিন্দমোটর থেকে ইংলিশবাজার অবধি বিস্তৃত) এন্তার এন্টারটেনমেন্টের ঢেউ দীঘার সমুদ্রকে দু ঘা দিয়ে হারিয়ে দেয়।

এই যে পড়ার অনীহা, বিবেচনাবোধ থাকা মানুষমাত্রেই জানেন, এটা জায়েজ।

একজন লোক বলছেন, “আমাদের দেশে কলার পাতায় খাওয়া তো কোনদিন লজ্জাকর ছিল না, একলা খাওয়াই লজ্জাকর ।” তাঁর লেখা পড়লে ধর্মহানির আশঙ্কা ! আমরা চিরটাকাল একলা খাবো একলা খাবো ( এমনি তোলার টাকাও) একলা খাবো রে করে এলেম নতুন দেশে---  রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে কি জাতিচ্যুত হব !
রবীন্দ্রনাথ আরেক জায়গায় বলছেন ,জুয়াখেলার  যেমন  মোহ আমাদের অনেক দেশে মামলা মোকদ্দমার প্রতিও সেই মোহ দেখা যায় ।

এটার অদ্ভুত ভালো জাস্টিফিকেশান পাওয়া যায়  তপন রায়চৌধুরির রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তের পরচরিতচর্চা –বইতে। অননুকরণীয় ভাষায় অধ্যাপক রায়চৌধুরি বলছেন ওঁদের বরিশালে গ্রাম্য লোকেদের উদবৃত্ত টাকা হলে একজন অন্যের সঙ্গে পরামর্শ করত—কী করা যায় বল দেখি, আরেকটা বিয়ে করি , না কাকার সঙ্গে আরেকটা মামলা লড়ি। এখন এঁদের বংশধরেরা যারা সেই টাকা পয়সা বজায় রেখেছে বাংলায় হলে বছরে একবার করে কবিতার বই ছাপায় নিজের টাকায়, অন্য  রাজ্যে হলে ঘোড়া কেনাবেচা করে ।
রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের কাছে at all জরুরী নন বলে আমি মনে করি।
রবীন্দ্র রুচির সঙ্গে সাধারণ মানুষের  রুচি ,গণরুচি যাকে বলে- তা মেলে না ঘটনাচক্রে। আর সেটা সমাজের একেবারে ওপরতলার লোক থেকে একেবারে খেটেখাওয়া লোক অবধি সবক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য ।

রবীন্দ্রনাথ বলছেন, সাম্যের দরবার করিবার পূর্বে সাম্যের চেষ্টা করাই মনুষ্যমাত্রের কর্তব্য। তাহার অন্যথা করা কাপুরুষতা  ।
এটাই তো বেসিক জায়গা- আমার বাড়ির ড্রেনে আমি ছাড়া সবার নোংরা করা নিষেধ, এ মন নিয়ে  আমরা সাম্যের আশা করি।
রবীন্দ্রনাথের  দৃষ্টান্ত দিই , নারীর মনুষ্যত্ব নামের একটা লেখায় রবীন্দ্রনাথ বলছেন, আমাদের একমাত্র অবাধ অধিকারের ক্ষেত্র আমাদের স্ত্রী। সেখানে আমাদের যোগ্যতার কোনো নিশানা দাখিল করতে হয় না ।

অথচ দেখা যায়, আমাদের বাড়ির মেয়েরা সুখী মানুষের ভাব করে থেকে যায়—ছোট থেকে সংসারে না বুঝে বাবার, পরে বুঝেও সামান্য সুবিধেবাদিতার বিরোধিতা করতেও দ্বিধা হয়। অথচ যত বিপ্লব ফেসবুকে “মেয়েবেলা” কবিতা-গদ্য লিখে! কেন মেয়েবেলা ! তসলিমা নাসরিন বলে দিয়েছেন বলে! ছেলেবেলা একটা টার্ম , সেটা উচ্ছেদ করে শুধু মেয়েবেলা লিখেই নিজের মেয়েসত্তা প্রকাশিত হলে আর রিভোল্ট করার দরকার কী ! সেটাই তো একেবারে সোজা উপায়। চোখ কান বুঝে ক্রিজ থেকে এগিয়ে গেলাম। বলের লাইন দেখলাম না। পেছনে উইকেটকিপার বলটা ছুঁয়ে দিল ,আউট ।  নায়কের সৌম্যেন বসুর মতো উত্তমকুমারের পিঠ চাপড়ে বলার মতো বলতে হয়, ফিনিস ফর অল দ্য টাইম –বুঝলি!

রবীন্দ্রনাথ কেন তাঁর আগে জন্মানো কারো কথাই বাঙালি শোনেনি। বাঙালি কি বিদ্যাসাগরের কথা শুনেছে  উল্টে এই বাঙালি বিদ্যাসাগরকে মারার জন্য লোক লাগিয়েছে , রামমোহন রায়ের কথা ! ফলে শিল্প সাহিত্য যতই টেকনিক্যালি উন্মুক্ত হোক- একটা শ্রেণীর
কুক্ষিগত বিষয়। তারমধ্যে থেকে সমাজের একেবারে প্রান্তিক ছেলে বা মেয়েটা যে রবীন্দ্রনাথ পড়বে, ওপর তলা তাকে সুযোগ দেবে না! সমাজে মার্জিনালাইজডকে মার্জিনালাইজড না রাখতে পারলে এক শ্রেণীর বিপ্লব সাধন হবে না! এ অনেকটা পরিযায়ী আত্মীয়ের মতো। একজন আত্মীয় ধরা যাক কাজের সূত্রে আসে- কলকাতায়। তার প্রতিপত্তি অনেক। সে ফেরার পথে হাতে করে বাড়ির বেকার ছেলেটাকে ৫০০ টা টাকা করে দিয়ে যায়! তার এত প্রতিপত্তি সে যদি কান ধরে তাকে একটা দোকানে কাজে লাগিয়ে দিতে কি পারে না, পারে- দেবে না। না হলে দাতা- গ্রহীতার চেনটা নষ্ট হবে যে।

যে ছেলেটা সকালে বাবাকে চাষের জমিতে পান্তা ভাত আলুভাজা পৌঁছে দিয়ে এসে চান করে চার কিলোমিটার দূরে ইস্কুলে যায়—ফিরে মায়ের সঙ্গে ঠোঙ্গা বানায়। তার কাছ থেকে সোনারতরী শোনা পাপ! আর ইতিহাসের মূল সুতো এখানেই। তাই রবীন্দ্রনাথ, সবার না , কারো কারো।

Write comment (1 Comment)
IMG 20180320 WA0030
কবিতার কাছে আসা
সোমনাথ শর্মা
 

কবিতা নিয়ে একটা গদ্য লেখার সুযোগ জুটছে। এখন মুস্কিল হচ্ছে কবিতা আর গদ্য এই দুই স্বামী- স্ত্রীকে নিয়ে লিখতে বসা দুরূহ কাজ । কাকে কবিতা বলব না, ভাবতে থাকি । অবন ঠাকুরের এক আধটা লাইনও কি কবিতা নয় ?

“ বন্ধুরা বিদ্রুপ করে তোমাকে বিশ্বাস করি বলে ;

তোমার চেয়েও তারা বিশ্বাসের উপযোগী হলে

আমি কি তোমার কাছে আসতাম ভুলেও কখনো ?’’

অলোকরঞ্জনের এই লাইনটা আমার কাছে অনবদ্য গদ্যের আকর্ষণ তৈরি করে । প্রথম দেড় ওভারেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যাকে লোকে কবিতা বলে এসছে, তা নিয়েই কথা বলবো । যাকে কবিতা বলেনি, তা নিয়ে নয় । অর্থাৎ অফ এর বাইরের বল খেলব না । যে বয়েসে লোকে লীলা – সুকুমার পড়ে, সে বয়েসে আমি ক্রিকেট আর গান নিয়ে মজে থাকতাম । এরপরেও বহুবার একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক দৈনিক পড়েও পিছিয়েই রয়েছি । কবিতার সাথে আমার যোগাযোগ চল্লিশ বছর বয়েসে বিবাহের মত । ‘ বিবাহ’ শব্দটা লিখে যেটা প্রথমেই মনে হল,

তোমার বিবাহ মধ্যরাতে- সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড় আনন্দের সময় নয়—শীর্ষক কবিতায়, এই লাইনটা লিখে শক্তি চট্টোপাধ্যায় যে আনপ্রেডিক্টেবল সেটা আবারও মনে করালেন। শক্তিকে আমি বরাবর বীরেন্দ্র শেহবাগ মনে করে এসছি। যারা কবিতাটা মনে করতে পারছেন দেখুন কবিতাটার চলন । অবশ্য এই লাইনটা যে লিখবেন এসে, সেটা কিন্তু শক্তির পাঠকের আঁচ পাওয়ার কথা। যেভাবে বীরেন্দ্র শেহবাগের ওভারের প্রথম দুটো তিনটে বল খেলা দেখে আঁচ করতাম , ওভারের পাঁচ নম্বর বলটার কপালে কী নাচছে ! দেখুন-

‘ হ্যান্ডস আপ’—হাত তুলে ধরো—যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ

                         তোমাকে তুলে নিয়ে যায়

তুলে ছুঁড়ে ফেলে গাড়ির বাইরে, কিন্তু অন্য গাড়ির ভিতর

যেখানে সব সময় কেউ অপেক্ষা করে থাকে--- পলেস্তারা মুঠো করে

বট চারার মতন

কেউ না কেউ, যাকে তুমি চেনো না ।

অপেক্ষা করে থাকে পাতার আড়ালে শক্ত কুঁড়ির মতন

মাকড়সার সোনালি ফাঁস হাতে, মালা

তোমাকে পরিয়ে দেবে—তোমার বিবাহ মধ্যরাতে

এ এক দীর্ঘ যাত্রা পথ।

বিবাহ বলতেই আর একটা যে কথা বা লাইন মনে এলো- বিবাহের রঙে রাঙা হয়ে আসে সোনার বরণআমার গোধূলি লগণ এলো বুঝি কাছে—হেমন্ত গেয়েছিলেন পঞ্চাশের দিকে । এখানেই রবীন্দ্রনাথ । বিবাহের রঙ ঐ তোমার বিবাহ মধ্যরাতে- এর মত ফ্রেজ তৈরি করতে পারেন এঁরা ।

আসলে যেটা মনে হয়, বারবার মনে হয়, যেটা অপ্রাপণীয় ব্যক্তিজীবনে, যা সত্যিই  অ্যাচিভ করা যাবে না, সেটা পেতেই মানুষ শিল্প সাহিত্য সিনেমার কাছে যায় । আমার কাছে তো গরম হাওয়ার শেষ দৃশ্যটাও মনে হয় কবিতা। একদল লোক স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে, এদিকে বলরাজ সাহানিও দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ছেলে ফারুখ শেখকে নিয়ে। শেষ অবধি ছেলেকে ছেড়ে দিলেন, মিছিলে মিশে গেল ফারুখ শেখের মুখ---- হামারি মাঙ্গে পুরি করো । বলরাজ আর কোনোদিন ঐ মিছিলে যেতে পারবেন না, যে যেতে পারবে তাকে ছেড়ে দিলেন।

কবিতা আসলেই বিশ্বাস রাখার জিনিশ । ছন্দ – অলঙ্কারের বাইরে এ বিশ্বাস । যেভাবে মানুষের ওপর বিশ্বাস , ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস--- ইনসাফকা মন্দির হ্যায় ইয়ে/ ভগবানকা ঘর হ্যায়... সেই বিশ্বাস।

প্রথম কবে কবিতা পড়েছি মনে নেই। বি এ পড়তে গিয়ে শক্তির কবিতায় যে একবার পড়েছিলাম, সেখান থেকে এখনো উঠতে পারিনি । কবিতার একটা বড় গুণ হল, যে জীবনে ছিটেফোঁটা কবিতাও পড়েনি কবিতা তাকেও নাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে একসাথে অনেকে একত্রে দাঁড়িয়ে আছে, ওরই মধ্যে একজনকে উদ্দেশ্য করে আপনি বললেন, ‘বাটিকে – আঁকা আকাশে দিনশেষে/ তুমি আমার প্রিয়,/ রয়েছে যারা তোমার পরিবেশে/ তারাও ঈশ্বরীয়’ যাকে প্রিয় বললেন, তিনি তো বুঝলেনই, পাশের সকলে বুঝলেন, যাক আমি শচীন নই, অন্তত ভিভিএস লক্ষণ ।

যদিও এটা খুব সোজা করে বলে দেয়া গেল তবু সত্যি এটাই। নাহলে যে জীবনে কষ্টের মুখ দেখেনি হয়তো সোনার চামচ মুখে করেই জন্মেছে, এমন মানুষেরও তো শ্রমজীবী মানুষের জন্য লেখা কবিতা পড়ে/ শুনে চোখে জল আসে। যে জীবনে প্রেমে আঘাত কী, বোঝেনি। অদ্ভুত চরিতার্থতায় ভরা জীবন। সেও তো বিচ্ছেদের কাহিনী শুনে কষ্ট পায় ।

কবিতা আমাদের যেমন পৌঁছে দেয়, নিজেকেও পৌঁছে দেয় একইভাবে লৌকিক থেকে অলৌকিকতায় । ‘ রানার’ কবিতাটা একবার মনে করে দেখুন, পাঠক। রানার ছুটেছে ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে/ রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে... চলছে--- এক জায়গায় এসে চমকে উঠতে হয়, ‘ দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি’--- এ লাইনটা অলৌকিক হয়েও লৌকিক, আবার উল্টোটাও ভীষণভাবে। এই লাইনটারও একটা হয়ে ওঠা আছে। খেয়াল করলেই পাবো – ‘ এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনদিনও/ এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ ।’ এই লাইনদুটো না থাকলে, চোখ কাঁপে মিটিমিটি’র লাইনটা লেখাই যেত না। যেভাবে লেখা যেত না, ‘কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে/ বড্ড বেশি মানুষ গেছে বাণের জলে ভেসে’ – এই লাইনটা , ওর আগের লাইনগুলো না থাকলে ।

কবিতার ক্ষেত্রে আরো আমার আরো একটা আগ্রহের বিষয়, কবিতায় গল্প।“ মন মানেনা বৃষ্টি হল এতো/ সারাটি রাত ডুবো নদীর পাড়ে/ আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল/ স্পর্শ করি জলের অধিকারে”------- উৎপলকুমার বসুর এই কবিতাটাও গল্প। আবার -----

                       শিবস্তোত্র - ২

                       মণীন্দ্র গুপ্ত

   চোর ডাকাত সংসারী ভিখিরি সবাই এসে

   মাথায় হাত বুলিয়ে যায় । ওঁর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ।

   উনি টের না পেলেও, চোরের হাতের তেলচিটে ছায়া ,

   ডাকাতের হাতের ক্ষারস্পর্শ, বিষয়ীর হাতের

   খট্টাশ গন্ধ, সব ওঁর মাথায় লেগে থাকে ।

   শিবলিঙ্গের উপর দিয়ে ইঁদুর, সাপ, শুকনো পাতা

আর দিনরাত্রি চলে যায় ।

উনি কি ওখানে আছেন, না কি নেই – বোঝা যায় না ।

শুধু যেদিন শিবচৌদশীতে বিবাহযোগ্যা মেয়েরা দলে দলে এসে

ওঁর কাছে দীপ জ্বালে, ছোঁয়

বছরে শুধু সেই এক দিনই

একটি করস্পর্শে আচম্বিতে ওঁর ভিতরের আগুন ধকধক করে ওঠে –

বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন আবার নির্বিকার ঃ

স্মৃতিকে ভস্মের মতো ব্যবহার করেন ।

আসলে কবির কাছে যে কোন কবিতাই প্রথমে ঘটনা, একটা কেস। সেটা তিনি বয়ান করছেন প্রথমে নিজের কাছে, পরে অন্যের কাছে। যেভাবে ঝানু উকিল একটা বিরাট স্পিচ তৈরি করে, প্রথমে নিজের কাছে বলেন, পরে বলেন দরবারে।

কী অদ্ভুতভাবে কবিতাটায় মানবত্ব আরোপ করলেন মণীন্দ্রবাবু,

“শুধু যেদিন শিবচৌদশীতে বিবাহযোগ্যা মেয়েরা দলে দলে এসে

ওঁর কাছে দীপ জ্বালে, ছোঁয়

বছরে শুধু সেই এক দিনই

একটি করস্পর্শে আচম্বিতে ওঁর ভিতরের আগুন ধকধক করে ওঠে –

“একটি করস্পর্শে”--- কথাটা বোধহয় সব কথা বলে গেল।

যেমন এই মুহুর্তে একটা গান মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের। রুপে তোমায় ভোলাব না। জীবনে এ গানটার আমার বিশেষ প্রয়োজন থাকত না, যদি না, ‘ জানবে না কেউ কোন তুফানে/ তরঙ্গ দল নাচবে প্রাণে’- এই লাইনটা লেখা হত ওঁর কলমে । অদ্ভুত ডায়মেন্সানে শেষ হচ্ছে, চাঁদের মত অলখ টানে/ জোয়ারে ঢেউ তোলাব। একটা টেক্সটের আয়ু বাড়িয়ে দেয় এমন কিছু লাইন। রুপে তোমায় ভোলাব না/ ভালোবাসায় ভোলাব--- এ যে কোন সেন্সেটিভ লোক লিখতে পারে। হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাব—এ ও কিন্তু নজরুল বলে চালিয়ে দেয়া যায় । কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, ঐ কারণেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি লিখবেন, ‘ জানবে না কেউ কোন তুফানে/ তরঙ্গ দল নাচবে প্রাণে ।’ এখানেই একজন কবির থেকে অন্য একজনের স্বাতন্ত্র্য চেনা যায় ।

কবিতা একটা আয়নার মত। এ কথা নতুন কিছু নয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন না, নিজেকে নিজের মত করে দেখার জলজ দর্পণ, কবিতাকে । একটা কবিতা আমাকে বেশ কিছুদিন ধরেই জ্বালাচ্ছে, হ্যাঁ জ্বালাচ্ছেই।

“ যখন বিশ্বাস করবে তুমিই একমাত্র সৎ

আর জগতের সবাই তোমাকে প্রতারণা করছে

তখন জানতে পারবে না একটা সাইকেল কাগজ

খাগের কলম দোয়াত কালি নিয়ে তোমাকে ছেড়ে

ফিরে যাচ্ছে

যে বাঁশির ধ্বনি শুনে বেধেছিলে সুরের শ্রীচরণ

ফিরে যাচ্ছে

পাকশালে মালসায় রাখা সেদ্ধ ভাত, গব্য ঘৃত

ফিরে যাচ্ছে

ফিরে যাওয়ার পথে, কাগজ উড়ছে

কালি চলকে পড়ছে আলে

ফিরে যাওয়ার পথে, ধ্বনি তার একান্ত বাঁশিটিকে

কান্না পাঠাচ্ছে

একা অন্ন প্রার্থনা করছে শস্যরাশি

যেন তাকে ফের জন্মাতে না হয়

তোমার ভিক্ষাপাত্রে, অবিশ্বাসের দান হয়ে

তোমার পাকশালে, অহংকারের অন্ন হয়ে”

   ( নিরর্থ – সুকল্প চট্টোপাধ্যায়)

এ কবিতায় কি নিজেকে দেখছি না ? কতবার ভেবেছি, ‘দুঃখে শোকে ব্যথিত চিতে’ আমি ভালো। শুধু তাই না, আমিই ভালো । এও তো একরকম অহং । অথচ দিনে –রাতে অহং ত্যাগের রাস্তা খোঁজাই একজন মানুষের শেষতম প্রাপ্তি হবার কথা ছিল । অহং ত্যাগের জন্য আমিও কি কাউকে বলিনিঅদ্ভুত একটা গান মনে পড়ল, ‘ওহা কৌন হ্যায় তেরা, মুসাফির , জায়েগা কাহা’ ----- একটা জায়গা আছে, তু নে তো সব কি রাহ বতায়ি/ তু অপনি মঞ্জিল কিউ ভুলা/ সুলঝাকে রাজা, অউরো কি উলঝন/ কিউ কচ্চে ধাগো মে ঝুলা...... কিউ নাচে সপেরাশৈলেন্দ্র লিখেছিলেন এই , কিউ নাচে সপেরা – এটা একটা গোটা কবিতা। সাপুড়ে নাচবে কেন ! সাপুড়ে তো নাচায় । এখানে কবিতা আর দর্শন এক হয়ে যায় ।

কবিতা হৃদয় থেকে বেরোয়, হৃদয়ই তার লক্ষ্য—একথা অরুণ মিত্র বলেছিলেন। সত্যিই কবিতা কি শুরু থেকে শেষ অবধি আশ্রয় নয় ? একজন পাঠক যে মনভঙ্গি নিয়ে প্রবন্ধের কাছে যান, সেভাবেই কি কবিতার কাছে আসেন ? এর উত্তর হল, না । নির্ভেজাল, না ।   কবিতা হল, খুব গরমে এক গ্লাস ঠাণ্ডা খাবার জলের মত। ঐ তেষ্টায় ৫০ টাকা দামের কফিও কোন কাজ করে না, যদি না এক গ্লাস জল পাওয়া যায় । কবিতার মূল্য এখানেই

জনসাধারণের কাছে কবিতার কিন্তু একটা acceptability আছেই। সে হয়তো ক্লাসে 

পারিব না কথা টি বলিও না আর
কেন পারিবে না তাহা ভাব এক বার,
পাঁচ জনে পারে যাহা,
তুমিও পারিবে তাহা,
পার কি না পার কর যতন আবার
এক বারে না পারিলে দেখ শত বার৷
পারিব না বলে মুখ করিও না ভার,
ও কথাটি মুখে যেননা শুনি তোমার,
অলস অবোধ যারা
কিছুই পারে না তারা,
তোমায় তো দেখি না ক তাদের আকার
তবে কেন পারিব না বল বার বার?
জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার
হাঁটিতে শিখে না কেহ না খেয়ে আছাড়,
সাঁতার শিখিতে হলে
আগে তবে নাম জলে,
আছাড়ে করিয়া হেলা, হাঁট বার বার
পারিব বলিয়া সুখে হও আগুসার৷

কালীপ্রসন্ন ঘোষের ( পারিব না) এই কবিতাটা হয়তো সে শুনেছে । কিন্তু কোনভাবে কবিতার সাথে পরে আর সংশ্রব গড়ে ওঠেনি। আম বাঙালি হয়তো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম জানে না। কিন্তু কবিতা সম্পর্কে একটা উচ্চ ধারণা তার আছেই। নাহলে বাঙালির চালু বাক্য হতে পারে না, কবি কবি ভাব/ ছন্দের অভাব। হয়তো খানিকটা ব্যঙ্গোক্তি, কিন্তু কটূক্তি নয়। বাঙালির কাছে কবিতা কিন্তু সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছেই।  যদিও এত সহজে ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তন হয় না।   পাঠক- কবি কারোরই হয়তো এ প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না যে, কোন এক মঙ্গলবার সকাল থেকে এবার লোকে সিরিয়াসলি কবিতা পড়বে, পড়া শুরু করবে । তা বোধহয় ঠিক নয়। বিপ্লব আর রোম একদিনে তৈরি হয়না । ভিড়ের থেকে আমার হৃদয় পরিবর্তনটা বেশি জরুরি। 

 

 

Write comment (1 Comment)