Author

Debasish Kuila ।। দেবাশিস কুইল্যা

দেশের বুকে মহামারী কালে কালান্তরে
দেবাশিস কুইল্যা

 

চীনের হুয়াং প্রদেশের এক মাছের বাজার থেকে কোরোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে । অজানা এই মারণ অনুজীবের সাথে যুদ্ধ করার প্রতিষেধক মানুষের আয়ত্বের বাইরে । তার ফলেই সারা বিশ্বে মহামারীর আকার নিয়েছে । সারা বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক আর হতাশা গ্ৰাস করছে প্রতিনিয়ত । এই ধরনের মহামারী পৃথিবীর বুকে এই প্রথম নয় । এমনকি আমাদের দেশেও নয় । কালে কালে এসেছে নানা রূপে নানাভাবে ।

১৮৯৮ সালের গোড়ার দিককার কথা। কলকাতায় কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল, বোম্বাইয়ে একটা ভয়ানক ব্যাধি দেখা দিয়েছে, তার নাম প্লেগ। এমন সময় একদিন সন্ধ্যায় বম্বে মেল থেকে নামলেন এক মহিলা। সেযুগের রীতি অনুযায়ী তাঁর মুখ ছিল ঘোমটায় ঢাকা। হাওড়া স্টেশনের বাইরে এখন যেখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড হয়েছে, আগেকার দিনে সেখানে ছিল ঘোড়ার গাড়ির আড্ডা। সেই মহিলা একখানি ঠিকে গাড়ি ভাড়া করে তিনি চললেন কলকাতায়। গঙ্গার ওপরে কাঠের পুল বেরিয়ে গাড়ি যখন হ্যারিসন রোডে, কোচোয়ান জানতে চাইল, কোথায় যাবেন মা? মহিলা গাড়ির ভেতর থেকে জবাব দিলেন, আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি প্লেগদেবী। কোচোয়ান আঁতকে উঠে পিছন ফিরে দেখে, গাড়িতে কেউ নেই।
ঊনিশ শতকের শেষভাগে প্লেগ নিয়ে এই গল্পটা ছড়িয়েছিল। তার কথা শুনিয়েছেন প্রেমাংকুর আতর্থী। তাঁর ‘মহাস্থবির জাতক’ বইতে আছে। কলকাতায় প্লেগ মহামারীর সময় প্রেমাংকুর নিতান্ত বালক। বয়স আট বছর। পরিণত বয়সে তিনি লিখেছেন, শহরে প্লেগ রোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্পোরেশন থেকে সবাইকে টিকে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগল। কিন্তু শহরবাসী তাতে রাজি হল না। গুজব ছড়াতে লাগল, প্লেগের টিকে নেওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত। কেউ আবার বলল, পেট থেকে এক পয়সা মাপের মাংসখণ্ড তুলে নিয়ে তার মধ্যে প্লেগের জীবাণু পুরে দেয়।
তখন কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান ছিলেন কুক সাহেব। অনেকে তাঁকে মারবে বলে সুযোগ খুঁজতে লাগল।
সেই আমলে সমাজে সর্বক্ষেত্রে ব্রাহ্মরা ছিলেন অগ্রণী। সাধারণ লোক যখন টিকে নেবে না বলে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তাঁরা স্বেচ্ছায় গেলেন টিকে নিতে। প্রেমাংকুরও ছিলেন ব্রাহ্ম ঘরের সন্তান। কুক সাহেব তাঁকে টিকে দিয়েছিলেন। তারপরে প্রবল জ্বর এসেছিল। ২৪ ঘণ্টা ছিলেন অচেতন।
১৮৯৮ সালের প্লেগ সম্পর্কে সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় যে বিবরণ পাওয়া যায়, সে খুব সাংঘাতিক। সেখানে আছে, ‘প্লেগের কথা শুনিয়া কলিকাতাস্থ লোকের আতঙ্ক ভয়ানক বৃদ্ধি পাইয়াছিল। সকলেই বিভব দূরে ফেলিয়া পুত্রকন্যা লইয়া শহর ত্যাগে প্রস্তুত হইল। সে ভয়, সে ভাবনা সহজে বর্ণনা করা যায় না…।’
সবাই ভেবেছিল, দূরে পালিয়ে গেলে মহামারীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে, ঘোড়ার গাড়িতে, আরও যেভাবে পারে শহর থেকে পালাতে চেষ্টা করল। স্ত্রী, সন্তানেরাও তাদের সঙ্গে ছিল।
তখন হাওড়া স্টেশনে, স্টিমার ঘাটে কাতারে কাতারে মানুষের ভিড় হল। রেল কোম্পানি বাড়তি ট্রেন চালিয়েও অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপ সামলাতে পারছিল না। এই সুযোগে ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, নৌকা, মুটে, সকলেই ভাড়া হাঁকতে লাগল চারগুণ, পাঁচগুণ।
এইরকম অবস্থা মাস তিনেক চলার পরে শহরে শুরু হল দাঙ্গাহাঙ্গামা। সরকার ঘোষণা করেছিল, কর্পোরেশনের লোক বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখবে, কারও প্লেগ হয়েছে কিনা। যদি রোগীর সন্ধান পায়, তাহলে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে।
একথা শুনে শহরে যত গরিব মানুষ ছিল, সরকারের ওপরে ভীষণ রেগে গেল। গুজব ছড়িয়েছিল, প্লেগ হাসপাতালে গেলে কেউ বাঁচে না। ডাক্তাররাই ইঞ্জেকশন দিয়ে রোগীকে মেরে দেয়। এমনকি প্লেগরোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য যে গাড়ি পাঠায়, তার ভেতরে বিষ মাখানো থাকে। সুস্থ লোকও সেই গাড়িতে উঠলে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যায়।
শহরের গরিব মানুষকে যেন একপ্রকার পাগলামিতে পেয়ে বসল। ঝাড়ুদার, মেথর, ভিস্তিওয়ালা ও কুলি-মজুররা বলল, আমরা কাজ করব না। ধর্মঘট। গোটা শহর আবর্জনায় ও দুর্গন্ধে ভরে উঠল। অনেকে দলবদ্ধভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কর্পোরেশন থেকে প্লেগের কোয়ারান্টাইন কেন্দ্র বানানোর জন্য ঠিকাদারদের দায়িত্ব দিয়েছিল। তাদের দেখলেই জনতা লাঠি নিয়ে তাড়া করত। অনেক নিরীহ ভদ্রলোকও ঠিকাদার সন্দেহে মার খেল।
শেষকালে বাংলার ছোটলাট স্যার জন উডবার্ন ঘোষণা করলেন, প্লেগ হলে সকলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে না। বাড়িতে একটা পরিষ্কার ঘরে কোয়ারান্টাইন করে রাখলেই চলবে। তাতে মানুষের ক্ষোভ কিছুদূর প্রশমিত হল।
কলকতায় যখন প্রথম প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে, স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন দার্জিলিং-এ। আমেরিকা থেকে ফিরে অতিরিক্ত পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য গিয়েছিলেন শৈলাবাসে। প্লেগের খবর শুনেই তিনি কলকাতায় ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু মহামারীর মোকাবিলা করার জন্য অত টাকা পাওয়া যাবে কোথা থেকে? তার কিছুদিন আগে গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে বেলুড় গ্রামে জমি কেনা হয়েছিল। মঠ তৈরি হবে। স্বামীজি স্থির করলেন, জমি বিক্রি করে সেই টাকা প্লেগরোগীদের সেবায় ব্যয় করবেন। বাধা দিলেন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের জননী সারদা দেবী। তিনি বোঝালেন, শুধু একবার ত্রাণকার্য চালিয়েই কি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের কাজ শেষ হয়ে যাবে? মঠ থাকলে ভবিষ্যতেও বহুবার মানুষের সেবার কাজ হতে পারবে।
প্লেগ মহামারীতেই প্রথমবার ত্রাণের কাজ করেছিল তখনকার সদ্যগঠিত রামকৃষ্ণ মিশন। প্লেগ খুব ছোঁয়াচে রোগ। রোগীর ধারেকাছে কেউ যেতে সাহস পেত না। স্বামীজি ও তাঁর গুরুভ্রাতারা দরিদ্র বস্তিতে রোগীদের মধ্যে পড়ে থেকে দীর্ঘকাল সেবা করেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। তাঁর কথা শুনিয়েছেন সেকালের নামজাদা ডাক্তার রাধাগোবিন্দ কর। তিনি লিখেছেন, ‘একদিন চৈত্রের মধ্যাহ্নে রোগী পরিদর্শনান্তে গৃহে ফিরিয়া দেখিলাম, দ্বারপথে ধুলিধূসর কাষ্ঠাসনে একজন য়ুরোপীয় মহিলা উপবিষ্টা। উনিই ভগিনী নিবেদিতা।’
রাধাগোবিন্দ কর সেদিন সকালে বাগবাজারের বস্তিতে প্লেগে আক্রান্ত এক শিশুকে দেখে এসেছিলেন। সে কেমন আছে খোঁজ নেওয়ার জন্য ভগিনী নিবেদিতা ডাক্তারের বাড়ির সামনে বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করছিলেন। ছেলেটির খবর নেওয়ার পরে তিনি রাধাগোবিন্দ করের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, বাগদি বস্তিতে প্লেগের পরিচর্যা করা যাবে কীভাবে।

১৯১৮ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, তখন পৃথিবীর লোকসংখ্যা ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ কোটির মধ্যে। তার মধ্যে ৫০ কোটি লোকই আক্রান্ত হয়েছিল ইনফ্লুয়েঞ্জায়। মারা গিয়েছিল পাঁচ থেকে ১০ কোটি। মানুষের ইতিহাসে অত বড় মহামারী আর হয়নি।
কলকাতায় ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর বর্ণনা দিয়েছেন অতুল সুর। তাঁর ‘শতাব্দীর প্রতিধ্বনি’ বইতে আছে, ভারতে সেবার ৮০ লক্ষ লোক ইনফ্লুয়েঞ্জায় মারা গিয়েছিল। কলকাতাতেও এত মারা গিয়েছিল যে, শ্মশানে দাহ করার স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। গঙ্গার পাড়ে আধ মাইল জুড়ে মড়ার খাটগুলো রাখা ছিল।
এই মড়কের মধ্যেও কলকাতায় যুদ্ধজয়ের উৎসব করেছিল সাহেবরা। শ্যামবাজারে পোড়ানো হয়েছিল লক্ষ টাকার আতসবাজি। তার রোশনাইয়ে আলোকিত হয়ে উঠেছিল রাতের আকাশ।

ঝিনঝিনিয়া । এই রোগটারও বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন অতুল সুর। কলকাতার লোকে বলত ঝিনঝিনিয়া রোগ। ডাক্তারি পরিভাষায় তার নাম কী জানা নেই। ১৯৩৪ সালে ভয়াল ভূকম্পে ধ্বংস হয়েছিল বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সেই বছরই কলকাতায় দেখা দিল আর একরকম মহামারী।

সে ভারী অদ্ভুত রোগ। একটা সুস্থ মানুষ রাস্তা দিয়ে দিব্যি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, হঠাৎ পুরো শরীর ঝিনঝিন করে উঠল। ধপ করে পড়ে গেল রাস্তায়। আশপাশের লোক দৌড়ে এসে দেখল, তার শরীরে প্রাণ নেই। চিকিৎসার সুযোগও পাওয়া যেত না সেই রোগে। ঝিনঝিনিয়া রোগে শহরে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কে কোথায় মরে পড়ে থাকত বাড়ির লোক জানতেও পারত না। কেউ হয়তো রাস্তায় বেরিয়েছে, বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলে সবাই চিন্তায় আকুল হত। শেষে সবাই হাতে একরকম পিতলের চাকতি বেঁধে রাস্তায় বেরোন অভ্যাস করল। তাতে নাম ও বাড়ির ঠিকানা লেখা থাকত। কেউ যদি পথে মারা যায়, রাস্তার লোক ওই দেখে তার বাড়িতে খবর দিত।

মানুষের ইতিহাসে মহামারী ঘুরে ঘুরে আসে। সেই অষ্টাদশ শতকে বিষয়টিকে একভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন এক ইংরেজ ধর্মযাজক। তাঁর নাম টমাস রবার্ট ম্যালথুস। তাঁর তত্ত্বের মূল কথা হল, জনসংখ্যা যখন খুব বেড়ে যায়, তখন দেখা যায় খাদ্যাভাব। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃতি নিজস্ব উপায়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। সে পাঠিয়ে দেয় মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধ।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ম্যালথুসীয় তত্ত্বের কথা মনে পড়ছে অনেকের। যেখানে মহামারী পৃথিবীর বুকে নির্দিষ্ট সময়ান্তে ফিরে ফিরে আসে ।

সব শেষে একটা কথা বলা যায়। কোনও মহামারীই কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হয় না। একসময় আপনা থেকে তার তীব্রতা কমে আসে। জীবন ফিরে যায় নিজের ছন্দে।

এবার অবশ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা ভাইরাস ডেকে আনছে মন্দা। তার ধাক্কা সামলাতে অনেক সময় লাগবে। কথাটা সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়ার মতো নয় । অতীতকে সাক্ষী রেখে যেখানে ভবিষ্যৎ বেঁচে থাকে সেখানে অভিজ্ঞতার আলোকে তা কাটিয়ে উঠবে অচীরেই ।

যাই ঘটুক পৃথিবীর বুকে । আমরা এক এক কালে সময়ের আবর্তে ঠিক কাটিয়ে উঠতে পারব । কেননা অমৃতের পুত্র ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী । কোন দূর্যোগ পরাভূত করতে পারে না ।

তথ্যসূত্র ও ঋণ স্বীকার : -
*কলিকাতা সেকালের ও একালের : হরিসাধন মুখোপাধ্যায়,
*প্রাচীন কলিকাতা : নিশীথরঞ্জন রায়, অশোক উপাধ্যায় সম্পাদিত,
* প্লেগ : রাধাগোবিন্দ কর,
* কলিকাতা দর্পণ : রাধারমণ মিত্র,
* শতাব্দীর প্রতিধ্বনি : অতুল সুর ,
* অনন্যা সেবিকা নিবেদিতা : প্রব্রাজিকা অচিন্ত্যপ্রানা ,
* উদ্বোধন ; শারদীয় সংখ্যা ১৪১৩।

Write comment (1 Comment)

হরপ্পা
দেবাশিস কুইল্যা।

আর কিছু নয়, লালিত স্বপ্নের ইচ্ছায় এইটুকু চাই
সমস্ত দুঃস্বপ্নের পর যেন দেখি;
ঘুমের পবিত্র বাখরের সাথে রেখে গেছে সুস্বাদু জল
  চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার হাত।

তোমার এক পৃথিবী ভালোবাসার নীচে
অস্পষ্ট যে পথ চরাচর পার হয়ে-
শীর্ণতর প্রাচীন অক্ষরে গেছে বেঁকে,
সেখানে রোজ আমি
আশঙ্কা করি নতুন করে বিমান হানার।

এরপরও শরীরে তোমার হরপ্পা জন্মাল
তোমার হাত ধরে এক আকাশ নীল হল।
নাভীমূল আমার লালায় ধুয়ে গেছে সে অনেককাল;
তবুও হরপ্পা- আমাতে মিল খুঁজে পায়নি।

Write comment (0 Comments)

 মনকেমনের গদ্য
 দেবাশিস কুইল্যা 

জানিস ,অনেকদিন লেখা হয়ে ওঠেনি তোকে। সময়ের প্রান্ত সীমায় আবর্তিত হতে হতে কবেই পিষে গিয়েছি খেয়াল করিনি। সেদিন হঠাৎ একটা কাজের সূত্রে তোর কথা মনে পড়ল। বলব না আছিস কেমন। আগের মতোই চেতনার অলিন্দে তোকে দেখে নিচ্ছি , হয়তো বা পড়েও । তুই সেদিন বলেছিলি পাশাপাশি ছন্দবদ্ধ পায়ে নদীও উতল হয়। ছলাৎ ছল ঢেউ যেদিন ভেজালো আমাদের, সেদিনই তো পড়ে নিয়েছিলি হৃদয়ের অক্ষরমালা। উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা ছুঁতে পারিনি। তুই বলবি আবেগ। কেন রে ? সেদিনই তো একটা সরলরেখা দেখিয়ে বলেছিলি এই নদী । এই সেই। এর মধ্যে স্নান নিয়ে শরীর গহন হয়ে যেত ; বলে তুই ফিরে গেলি কাঁকররেখা ধরে। যে পথ গেছে বেঁকে জনঅরণ্যে। তারপর আর ফিরে দেখা হয়নি , যাওয়া হয়নি ওই পথে।
            ব্যাস , সেদিনই যে গেলি আর ফিরলিনা। এখানেই সব লেনদেন , কেনাবেচা , দেওয়া নেওয়া সব শেষ। তাই তো ? তারপর থেকেই সব আমার। আমাদের সময় পার করা কনে দেখা আলো , সন্ধ্যার আঁধারে আদর মাখানো ঝালমুড়ি , খুনসুটি, শীতের রাতে শিশিরের শব্দে আমাদের পরস্পর স্পন্দন , বসন্তের মাতাল শিহরণ , সব সব স্মৃতির অলিন্দে বন্দি হয়ে গেছে। ফেরে না আর। শুধু রয়ে গেছে তোলপাড় করা হৃদয়ের কাছে হৃদয় ফিরে আসার ডাক।
            এগুলো ছেড়ে সব নূতন করে শুরু করতে হল। আর সেখানে তুই কত সহজেই শুরু করে দিলি জীবন বেঁধে নেওয়ার গান। বোঝাতে পারব না কত কঠিন ছিল নূতন করে বাঁচার । নতুন করে শুরু করাটা কতটা কঠিন ছিল। তখনো সেই সময়টাকে ছুঁয়ে দেখি। শব্দরা অনুরণিত হয় আরো একটু স্পর্শে কাছে থাকার। সময় নির্মম নয় , নয় ঠকে যাওয়ায়। নির্মম বিজয়ী বেকারত্ব।
            মনে পড়ে তোর ! বৃষ্টিতে ভিজে একদিন বলেছিলি ; মানুষগুলোর মুখ পবিত্র বলে মনে হয়। তবুও কেমন লাগে যখন খাদ্য ও খাদকের চোখে আকাশ ও রোদ গা এলিয়ে দেয় শেষ উজ্জ্বলতায়। এসবের মাঝেও আমরা একটা পবিত্র পর্বের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি দেবলোকের দিকে। সামনে পেছনে কোনো ভয় নেই। একা পৌঁছে যাওয়া যায় যেখানে দিগন্ত মিলেছে রামধনু আকাশের গায়। এখন বলতে পারিস ? কেন যে বাক্যের রূপ পেল না আমাদের সেই পবিত্র ভাবনার শব্দরা!
            তোকে খুব অসহায় লাগতো তোর সময় পার হওয়া অপেক্ষার গুণুনীতে। সেদিন মনে পড়ে তোর ? আমরা দাঁড়িয়ে সময় ধরব বলে। একটা ছিঁটে ফোঁটা রোদ পড়েছে তোর বাসন্তী রঙ শাড়ির আঁচলে। একটা হ্যাংলা মুখ হাঁ করে তাকিয়ে। এটা পছন্দ করতিস না কোনোদিন। একটা দেওয়াল তুলতে বলেছিলি ওখানে। না , পারিনি। কেউ কি পেরেছে কোনোদিন ?  তাই কিছুটা বিছুটি বাতাস সইতে হয়েছে আমাদের। এখনও ক্ষত রয়ে গেছে তার। তুই তো জানিস না সে কথা। সুযোগও আসেনি আর।
            এই তো সেদিন অপেক্ষা করছি কাউকে ছোঁব বলে। একটা চেনা মুখ পাশ দিয়ে চলে গেল না চেনার ভান করে। বলার কোনো সুযোগই দিল না কেমন আছ ? বলতে পার আমাদের সময়টা আছে কেমন ?

Write comment (0 Comments)


অবাঞ্ছিত
দেবাশিস কুইলা

 অফিস ফেরত তিয়াস তার মায়ের অন্তিম শয্যায় ওকে লেখা শেষ চিঠি পড়তে পড়তে
দু চোখ ভিজিয়ে ফেলে। মা লিখেছে  ; -  বাবা তিয়াস , তোকে এটাই হয়তো তোর
মায়ের লেখা শেষ চিঠি। একটা কথা না জানালে মরেও শান্তি পাবনা। আমি তখন কলেজ ।
শ্রাবন মাস। বিকেল থেকেই মুষল ধারায় বৃষ্টি।মা অর্থাৎ তোর
   দিদিমা সেদিন বাড়িতে নেই। সন্ধ্যায় কেমন ভয় ভয় ভাব। এটা কাটানোর জন্য
আমাদের প্রতিবেশী আমারই সহপাঠী সুমন-কে ডেকে নিলাম টেলিফোনে অমলিন বিশ্বাসের
উপর। বৃষ্টির জন্য থেকে গেল ঐ রাত। সকালে ফিরে গেল নিবিড় সম্পর্কের চেতনায়
আমাকে বেঁধে। আমিও আবেগে আপ্লুত হইনি তা নয় । আমার এই শেষ মুহূর্তে তৈকে বলতে
দ্বিধা নেই ; সেদিন আমার বিশ্বস্ত সহপাঠী আমার গর্ভে রেখে গেছে তার পৌরুষের
ঔদার্য। সময়ের সাথে সাথে শরীরে প্রস্ফুটিত হল মাতৃত্বের চিহ্ন। লোক লজ্জা,
সামাজিক কদর্যতা আর পারিবারিক লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে সযত্নে আগলে রাখলাম আমার
প্রথম ভালোবাসার অঙ্কুর। সুমনকে জানালাম সবকিছু।  উপেক্ষার সাথে অস্বীকার
করল      তার পিতৃত্ব সঙ্গে আমাকে। দাঁতে দাঁত চেপে  জীবন যুদ্ধে নামলাম
কুমারী মাতৃত্বের স্বাদ নিয়ে। একটা ছোট কাজ জোগাড় করে নিলাম। একক মাতৃত্বের
পরিচয়ে যথাসাধ্য চেষ্টায় তোকে লেখাপড়া শিখিয়েছি । চাকরি সূত্রে বিদেশে
পাড়ি দিলি। আমার নিরুত্তরে অনেক বার জানার চেষ্টা করেও  আর জানতে চাসনি তোর
বাবার পরিচয়।  আজ মৃত্যু শয্যায় শুয়ে তোকে জানাই আমার প্রতিবেশী সুমন
সরকারের ঔরসে তোর জন্ম । কোথায় আছে সে এখন জানিনা। তবে তুই অবাঞ্ছিত নয়। এত
দিন  তোকে এ কথাটা না জানাতে পারার অক্ষমতার জন্য তোর অভাগী মাকে ক্ষমা করিস‌
। এখন ঈশ্বরের কোন ডাক এসেছে বলতে পারবনা ।
      ভালো থাকিস আমার সোনা বাবা । যে লোকেই থাকি তোর কাছে থাকব ।
         মায়ের  হাতের ভালবাসার শেষ অনুভূতি নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে রাতের আকাশে।
Write comment (0 Comments)