iswarchandra vidyasagar

Mohool Potrika
Login Here  Login::Register

বিনয় মজুমদারের কাব্যভুবন : আধুনিকতার মেধাবী সম্বিত ও যুক্তিতর্কের নন্দনবোধ ।। উৎপলকুমার মণ্ডল

 kobi binay majumdar mohool in

কবি বিনয় মজুমদারের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, বাংলা ৩১ এ ভাদ্র, ১৩৪১ তৎকালীন বার্মা অর্থাৎ বর্তমানের মায়ানমারের মিকটিলা জেলার তেডো শহরে। তাঁর পিতার নাম বিপিনবিহারী মজুমদার এবং মায়ের নাম বিনোদিনী মজুমদার। বিপিনবিহারী তখন বার্মার পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে ওভারসিয়ারের  চাকরি করতেন। ১৯৩৯  সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। এইরকম আতঙ্কের পরিবেশে, বিনয়ের বয়স যখন ৮ বছর, তখন তাঁরা বাধ্য হন দেশে ফিরে আসতে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার, বৌলতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে, সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন বিনয় মজুমদার। সেবার ক্লাসে প্রথম হন তিনি। আসলে আগাগোড়াই বিনয় মজুমদার ছিলেন মেধাবী ছাত্র। দেশভাগের পর, ১৯৪৮ সালে বিপিনবিহারী সপরিবারে ভারতে চলে আসেন এবং গাইঘাটার শিমুলপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। বর্তমানে জায়গাটি ঠাকুরনগর নামে পরিচিত।

 

১৯৪৮ সালেই বিনয় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউটের বউবাজার শাখায়।  ১৯৫১ সালে তিনি গণিতে আই.এস.সি পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়েই তাঁর সাথে পরিচয় হয়, সাহিত্যিক বিমলচন্দ্র ঘোষ ও রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে। প্রথম বিভাগে আই. এস. সি পাস করার পরে তিনি বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। এই সময়ে তাঁর সঙ্গে কল্লোলগোষ্ঠীর কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে, বিশেষত বিষ্ণু দে-র সঙ্গে তাঁর বেশ সখ্যতা গড়ে ওঠে। বিষ্ণু দে  তাঁর ‘সাহিত্যপত্র’ পত্রিকায় বিনয়ের কবিতা প্রকাশ করেন। ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা করলেও, এরপর থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। ১৯৫৮ সালে তিনি রেকর্ড নম্বর সহ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন।

 

এরপর তিনি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এ অধ্যাপনার চাকরিতে ঢোকেন। কিন্তু কবিতাপ্রেমিক চির-অস্থির বিনয় মজুমদার সে চাকরি বেশিদিন করতে পারেননি। এরপর ডেভলপমেন্ট অফিসার হিসেবে চাকরি করেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিক্যাল ইনস্টিটিউটে। এছাড়াও ত্রিপুরার গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা সহ জীবনে বহু কাজ তিনি করেছেন। কিন্তু কোনো জায়গাতেই তিনি বেশিদিন টিকতে পারেননি। যেমন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেয়েছেন অধ্যাপনা করার জন্য বা জাপান থেকে ডাক পেয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজের জন্য। কিন্তু কখনও স্বেচ্ছায় বা কখনও অনিচ্ছায়, সেসব চাকরি তিনি করেননি। আসলে তাঁর ভেতরে ছিলো কবিতামগ্ন এক ক্ষ্যাপাটে পুরুষ। গাণিতিক শৃঙ্খলা আর মননবিশ্বের নৈরাজ্য, তাঁকে করে তুলেছিল খানিকটা কবিতাগ্রস্ত। ফলে কোনো কাজই তিনি ধারাবাহিকভাবে করে উঠতে পারেননি। বহু ভাষায় কথা বলতে পারা, অসম্ভব স্মৃতিধর এই মানুষটি কবিতার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন। এ জন্যই জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁকে ‘কবিতার শহীদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

এ কারণেই ১৯৬০ সাল নাগাদ তিনি সিদ্ধান্ত নেন সারাজীবন কবিতাই লিখবেন। এবং আমরা জানি আমৃত্যু তিনি তাই-ই করেছেন। ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী। তাঁর দাদারা সবাই জীবনে প্রতিষ্ঠিত এবং চাকরিজীবি। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার তার পুত্রসন্তানের কাছ থেকে যেমনটা আশা করেন, মজুমদার পরিবার তাইই করেছিল। আর এই মানসিকতার জন্যই হয়তো, পরিবারের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সন্তানের, কাব্যসাধনার মতো একটি ‘আত্মধ্বংসী’ বিষয়কে, তাঁরা মন থেকে কোনোদিনই মেনে নিতে পারেননি। আর যতদূর সম্ভব সে কারণেই, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে চিরকাল অবহেলাই পেয়েছেন তিনি। এই সমস্ত বিবিধ কারণ তাঁর ব্যক্তিজীবনে, হতাশা আর আত্মধ্বংসের বান ডেকে এনেছে।

 

যাই হোক, সম্ভবত কলকাতাবাসের একটি পর্যায়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সহ তাঁর কৃত্তিবাসীবন্ধুরা ‘তাঁর মতো প্রতিভাবান কবি চাকরি করা উচিত নয় এবং সার্বক্ষণিক কবিতা লেখা উচিত’ এরকম একটি কথা বলে, তাঁকে ঠাকুরনগর পাঠিয়ে দেন। তাঁরা তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বন্ধুদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তাঁকে মাসোহারা পাঠানো হবে। তাঁদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে কবি শিমুলপুরে এসে স্থায়ীভাবে বাস করা শুরু করলেও, একবার- দুবারের মাসোহারা দিয়ে তাঁরা আর খোঁজ রাখেননি। এই ঘটনাধারা থেকে কখনো কখনো মনে হয় এর পেছনে বড় কোনো চক্রান্ত ছিল। তবে সঠিক তথ্যটা জানার জন্য, এই বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

 

বিনয় শিমুলপুর বা ঠাকুরনগরে ফিরে আসার পরে বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব তাঁকে ঘিরে ধরে। বিশেষত বাবা-মার মৃত্যুর পরে তিনি ভয়ানক একা হয়ে পড়েন। কবিতীর্থ প্রকাশিত ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কবিতায় তাঁকে বলতে শুনি– ‘সম্পূর্ণ একাকী আছি আমার নিলয়ে আছে সূর্য চাঁদ
ধুমকেতু তারা–
এদের নিয়েই আমি মেতে থাকি, বিশ্বযুদ্ধ করে করে
দিনরাত্রি কেটে যায় বেশ।’
( প্রকাশ জানুয়ারি ২০০১ ।। ISBN: 81-8656 6-38- 4 পৃষ্ঠা: ২৯)

 

এভাবেই দেখা যায় নিজের বাড়িতে প্রায় নির্বাসিত জীবন কাটাতে কাটাতে তাঁর সিজোফ্রেনিক অসুস্থতা চিরস্থায়ী হয়ে যায়। এরপর সারা জীবন ধরেই কখনো সুস্থতা কখনো অসুস্থতা নিয়ে, এক স্বেচ্ছা-দুস্থতার জীবন যাপন করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এরই মধ্যে সর্বক্ষণই তিনি কবিতা লিখে গেছেন নিরলসভাবে। যদিও কবিতা ছাড়া গল্পো, প্রবন্ধ, গান, ছড়া প্রভৃতিও রচনা করেছেন তিনি; কিন্তু কবিতাই তাঁর প্রথম প্রেম। সত্যিকথা বলতে কী সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর বা তাঁর কবিতার বিশেষ পরিচিতি না থাকলেও তিনি ছিলেন লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণপুরুষ। এর ফলে কবি-লেখক-সম্পাদকের প্রিয় ছিলেন তিনি। আসলে তাঁর স্বভাবের মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার সহজাত একটা প্রবণতা ছিল। এই প্রবণতার জন্যই হয়তো একসময় তিনি হাংরি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যদিও সেই সংস্রবের আয়ু ছিল ২ বছরের মতো। যাই হোক প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা, প্রতিষ্ঠানের হোমরা-চোমরা বন্ধুদের চক্রান্ত, শুধুমাত্র লিটিল ম্যাগাজিনে কবিতা প্রকাশ, প্রভৃতি তাঁকে লিটল ম্যাগাজিনের আইকন করে তোলে। এইসব কারণে লিটল ম্যাগাজিনের মানুষজনদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। যা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতেই পারেননি। এমনও দেখা গেছে তাঁর জন্মদিনে নিমন্ত্রণ ছাড়াই প্রচুর কবি-সাহিত্যিক পশ্চিমবাংলার দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছেন। এমনকী  বাংলাদেশ থেকেও নিয়মিত লিটল ম্যাগাজিনের লেখক-সম্পাদকেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। আসলে অপরিচয়ের এমন একটা ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে থাকলেও, তাঁর জীবিতকালে যতগুলি পত্রিকা তাঁকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা বের করেছে তা অন্যকোনো কবির জীবনে হয়েছে কিনা সন্দেহ। তাঁর জীবৎকালে, তাঁর সম্মতিতে, তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশে একটি এবং ভারতে একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। সত্যিকথা বলতে কী কবি-সাহিত্যিক এবং কবিতানুরাগীদের কাছে ২৯ বছর বয়স থেকেই তিনি জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আপামর জনসাধারণের কাছে তাঁর জন্য,  অপরিচয়ের অন্ধকারই ভবিতব্য ছিল। শুধুমাত্র তাঁকে এবং তাঁর মানসনারী গায়ত্রীকে নিয়ে গড়ে ওঠা মিথকল্প গল্পগাছাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর বাংলা কবিতায় তাঁর অসামান্য দাগ রয়ে গেছে মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

 

আসলে কোলকাতা থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়ে ঠাকুরনগরের মতো নিস্তরঙ্গ এলাকায় বসবাস করার জন্য এবং ব্যক্তিগতভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতার জন্য, বিনয় মজুমদার গণমাধ্যমের প্রচারের আলো কোনোদিনই পাননি। আবার যে সমস্ত সংস্থা সাহিত্যের বিভিন্ন পুরস্কার প্রদান করেন, তাঁরাও চিরকাল আলোকিত ব্যক্তিদের নিয়ে মাতামাতি করেন। এ কারণে দেখা যায় ‘ফিরে এসো চাকা’ বা ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র মতো কাব্যগ্রন্থগুলি কবিজীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসেও কোনো সরকারী বা বেসরকারী পুরস্কার পায় না। অথচ এই সমস্ত পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থার মাথায় তখন বিনয়ের বন্ধু-বান্ধবেরাই রয়েছেন। এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে অদ্ভুত এক শীতলতা লক্ষ্য করা গেছে।

 

অথচ পরবর্তীতে দেখা গেছে প্রচারের আলোয় না থাকলেও, তাঁকে ঘিরে একটি লেখকবৃত্ত তৈরি হয়েছে। এই ‘বিনয় পরিমণ্ডল’ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁকে আগলে রেখেছিল। মূলত লিটল ম্যাগাজিনের কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদকেরাই তাঁকে নিয়ে হই হই করেছেন এবং তাঁর কবিতা নিয়ে প্রচার করেছেন, লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে ছেপেছেন। আর এর ফলে অনেকটা গেরিলাযুদ্ধের কায়দায় দিন দিন বিনয় মজুমদার এবং তাঁর সাহিত্যের প্রচার-প্রসার হয়েছে। এঁরাই প্রতিবার অসুস্থতার সময় কবির শুশ্রূষা করেছেন, হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। এই অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হয় ২০০৫ সালের পর থেকে। এই সালেই ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তাঁকে ভারত সরকারের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয়। এর পরপরই তাঁর ‘কাব্যসমগ্র ২’ এর জন্য দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার। এই দুটি পুরস্কারের পরে গণমাধ্যম এবং জনগণের নজর পড়ে এই চিরবঞ্চিত প্রতিভাবান কবি ও বৈজ্ঞানিকের উপর। যদিও আরো কয়েকটি ছোট-বড়ো পুরস্কার পেয়েছিলেন।

 

বিনয় মজুমদারের কবিতাকে আমরা বলছি বৈজ্ঞানিকের রসসম্বিত। তাঁকে আমরা বলি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ বা কবি। এখানে বিজ্ঞানমনস্কতা এবং বিজ্ঞান সচেতনতা শব্দদুটির পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদিও আমরা সচরাচর শব্দটিকে একটিই অর্থে প্রয়োগ করি। তবুও এদের মধ্যে একটি বড়ো পার্থক্য রয়েছে। এমন হতে পারে সমাজে বিজ্ঞানের দানগুলি সম্পর্কে কেউ সচেতন থাকতেই পারে। প্রয়োজনে বিজ্ঞানকে তারা তাদের প্রয়োজনে লাগাতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ বিজ্ঞানমনস্ক হবে। জীবনের যেখানে যেখানে দরকার তারা তাকে ব্যবহার করে। কোথাও তাকে কাজে লাগায়, কোথাও ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা কুসংস্কারকে পাত্তা দেয়। কিন্তু যে ব্যক্তি বৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনাকে নিজের জীবনের সমস্ত কাজে, ভাবনায় বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ করে বা সমস্ত কাজকর্ম বা আচার-আচরণে যুক্তিবাদকে প্রশ্রয় দেয়, তাদেরই আমরা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ বলতে পারি। যুক্তি-তর্কের প্রতি তার স্বাভাবিক টান থাকবেই।

 

বিনয় মজুমদারের কবিতা পড়ার সময় আমাদের এই বিষয়টিকে মাথায় রাখতে হবে। অনেক কবিকেই আমরা জানি বিজ্ঞান সচেতন। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বিজ্ঞান-সচেতন একজন মানুষকে আমরা পাই। কিন্তু বিনয় মজুমদারের কাব্যভাষার মধ্যে বৈজ্ঞানিক যুক্তি-পরম্পরা এতটা প্রকট এবং প্রবল যে, তা তাঁকে বাঙলাকবিতার ইতিহাসে অনন্য এক পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু এটাও ঠিক, এই বৈজ্ঞানিক কাব্যভাষা শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক সূত্রাবলী বা ঘটনার কচকচানি বা শুকনো বিবরণ হয়ে ওঠেনি। বরং আশ্চর্যজনকভাবে তা রসোত্তীর্ণ কাব্য হয়ে উঠেছে। আসলে যুক্তিবিদ্যার সঙ্গে রসশাস্ত্রের অলৌকিক এক সম্মিলন-কৌশল তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। অলঙ্কারশাস্ত্র নিয়ে খুব একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে তিনি করেছিলেন তা নয়। সারাজীবন তিনি মূলত মিশ্রকলাবৃত্ত তথা পয়ারেই অধিকাংশ কবিতা লিখেছেন। বলতে গেলে জীবনানন্দ দাশের পরে বিনয় মজুমদারই পয়ারে এক আশ্চর্য দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এমনও মনে হতো বিনয় মজুমদার কথাও বলতেন পয়ারের ছন্দে। আর এই দক্ষতা তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন একজন গণিতবিদ হওয়ার জন্য। আবার দিনলিপি হওয়ার জন্য, তাঁর কবিতায় যৌনতাও এসেছে প্রাত্যহিক স্বাভাবিকতার পথেই।

 

আমরা এটা স্পষ্টতই দেখতে পাই বিনয় মজুমদারের কাব্যভাষার প্রধান শৈলী তা মূলত দিনলিপির ঢঙে লেখা। এটা তাঁর একটি সচেতন কাব্যরীতি। তিনি বিভিন্ন জায়গায় এমনকি কবিতায়ও সেটা জানিয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে এক সর্বাত্মক মিলনের ভাবনা থেকে তাঁর এই প্রত্যয় জন্মেছে বলে আমার মনে হয়েছে। সর্বপ্রাণবাদও এখানে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে–

‘পৃথিবীর ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি– সবার জীবনী লেখা হলে
আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা না হলেও চলে যেত বেশ।
আমার সকল ব্যথা প্রস্তাব প্রয়াস তবু লিপিবদ্ধ থেকে যেত।
তার মানে মানুষের, বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক
অসংখ্য জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে...’
                                 (এ জীবন)

 

দিনলিপিধর্মীতার জন্য তাঁর কবিতার বাচনভঙ্গি হয়ে উঠেছে আটপৌরে। আটপৌরে বলেই আপাত-সরল। কিন্তু এর সঙ্গে মিশেছে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা। বিজ্ঞানী হিসেবে জীবনের কার্যকরণের সূত্রগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে তাঁর রচনায়। আবার পড়ুয়া বিনয় মজুমদারের জ্ঞানের গভীরতার জন্য সেই আটপৌরে দৈনন্দিন কথাবার্তায় মিশে গেছে শাশ্বত জীবনবোধ। বৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনা তাঁর কবিতায় দিয়েছে যুক্তিগ্রাহ্যতা। আর এই গাণিতিক অনিবার্যতা তাঁকে আধুনিক কবিতান্দোলনের মেধাবী-সম্বিৎ করে তুলেছে। আর তাই তাঁর নন্দনবোধকে দিয়েছে নোতুন এক সমুন্নতি।

 

মহুল ওয়েব প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যা



করোনা Diary



আমাদের কথা

আমাদের শরীরে লেপটে আছে আদিগন্ত কবিতা কলঙ্ক । অনেকটা প্রেমের মতো । কাঁপতে কাঁপতে একদিন সে প্রেরণা হয়ে যায়। রহস্যময় আমাদের অক্ষর ঐতিহ্য। নির্মাণেই তার মুক্তি। আত্মার স্বাদ...

কিছুই তো নয় ওহে, মাঝে মাঝে লালমাটি...মাঝে মাঝে নিয়নের আলো স্তম্ভিত করে রাখে আখরের আয়োজনগুলি । এদের যেকোনও নামে ডাকা যেতে পারে । আজ না হয় ডাকলে মহুল...মহুল...

ছাপা আর ওয়েবের মাঝে ক্লিক বসে আছে। আঙুলে ছোঁয়াও তুমি কবিতার ঘ্রাণ...

 

 

কবিতা, গল্প, কবিতা বিষয়ক গদ্য পাঠাতে পারেন ইউনিকোডে ওয়ার্ড বা টেক্সট ফর্মাটে মেল করুন [email protected] ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- www.mohool.in এ প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু ও মন্তব্যের ব্যাপারে সম্পাদক দায়ী নয় ।