একক কবিতা সন্ধ্যা ।। মিঠুন চক্রবর্তী

mithun

মিঠুন চক্রবর্তী-র এক গুচ্ছ কবিতা 

 

 

ঋণ

 

বিবর্ণ সন্ধ্যায় ঘরে এসে বসে আছে ঋণ
কী দেবো তাকে? 
কিছু মায়াময় শব্দ ছাড়া কিস্যু নেই হাতে
ভ্রমণপিপাসু দু'চোখ আমার 
ক্ষণিকের জিরিয়ে নেওয়া অতিথি নিবাস
নির্বাক অন্ধকারে পুড়ছে একাকী মোম
এমন উদাসীন প্রেক্ষাপটে কে পাঠালে মোহনিয়া ঋণ ! 

 

নক্ষত্রভ্রমণ সেরে ফিরে আসা
পোড়া পালক এবং মাংসে আমার জোনাকি মলম
লাগালো যে বিশল্যকরণী রাত
আমি তাতে  ঝাঁপ দিয়ে আপাদমস্তক ডুবে যাবো

 

 

দাহ

 

বৃক্ষ রোপণের অভ্যেস রাখিনি আর
শ্মশানে সারা রাত 
শুকনো কাঠের আগুনে খোঁচা দিয়ে শব দাহ করা কাজ,
মৃত চামড়া, মৃত চোখ, মৃত মেরুদণ্ড, মৃত পাকস্থলি এবং 
রোমান্টিক কবিতার বইয়ের মতো গোলাপি ও আয়তাকার স্বপ্নক্ষেত্র
পুড়ে যায় সহজেই .... তবু ,  আগুন কী সব পোড়াতে পারে ! 
রাত বাড়ে.... শুধু, রাত বাড়ে....

হে নিষাদের তীরে হত প্রেমিক ঈশ্বর,
তোমারও কী সবটুকু শূন্য করে পোড়াতে পেরেছিল আগুনের মাথাউঁচু স্রোত ?   

 

একাকী তারাখসার মতো শিশির ধোয়া অপরাজিত  নীল নাভিকুণ্ড, 
অবশিষ্ট আমার
একদিন খুব ভোরে চুপিচুপি ভেসে যাবো প্রিয় যমুনার চাঁদধোয়া জলে

 

জানি, পৃথিবীতে শূন্য বলে প্রকৃতপক্ষে কিছু পড়ে থাকে না কখনো

 

 

স্বপ্ন

 

একটি বর্ষা যতখানি বদলে দিতে পারে
নদীটির গ্রাফ,
জমাট অন্ধকার ছিঁড়ে হু হু করে ছুটে আসে
মশাল যুবক

 

তেমনই একটি মহার্ঘ্য চুম্বনের লোভে
আজও ঘরময় ছড়িয়ে আছে 
ফুটন্ত ভাতের গন্ধ...
সদ্য লাগানো বাতাবিলেবুর চারা

 

আর মায়ের শ্যাওলা জমা সেলাই-মেশিনের
রাতজাগা খট্ খট্ খট্...

 

 

পুরুষ এবং সমুদ্র

 

সমুদ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে একাকী পুরুষ

তবু, মনে পড়ে না তোমার ?
রত্নাকর, সমুদ্রের অপ্রচলিত নাম 

গভীরতার খাঁজে খাঁজে প্রবাল প্রাচীর, 
ঝিনুকে গোপন মুক্তা, পান্না জমা কঠিন অশ্রুথলি ।

'রত্নাকর' নাম শুনে 
এখনো তোমার কাছে নিঝুম দুপুরে এসে পায়চারি করে
রক্তমাখা রাত-কাঁধে ঝুঁকে পড়া লোক,
যে বাল্মীকি হতে চেয়েও পিছুটানে ঘরে ফেরে রোজ

 

 

বিশ্বাস

 

লাল ধুলোর উপর ওই যে হাঁটছে পথ
আমাদের বিষাদনগর ছাড়িয়ে....
মাথা নিচু, নেমে গেছে অরণ্যের পায়ে, 

 

সবুজ ডাবের ভেতর নরম জলের মতো গাঁ
যুবক মেঘের চওড়া বুকের নীচে 
 তৃষ্ণার্ত রমণীর দৃঢ় ইঙ্গিত
যেখানে মুষলধারায় বৃষ্টি হয়ে নামে

অনির্বাণ , 
এই পৃথিবীর রক্তমাখা মানুষেরাও নিশ্চিত একদিন 
সদ্যোজাতের বিষ্ময় চোখে এসে দাঁড়াবে এই পথে
বলবে, 
এমন ভালবাসা পেলে তীব্র অন্ধকার আকাশেও
গতজন্মের ছুরির ধারে বানাতে পারি কৃত্রিম চাঁদ

 

 

শান্ত মানুষ গাছের মতো চুপ

 

শান্ত মানুষ গাছের মতো চুপ
তবে পুরোপুরি গাছ হয়ে উঠতে পারে না
গতকাল আপনি তার পাতা ছিঁড়েছেন
সে টু শব্দটিও করেনি
আজ আপনি তার ফুল ছিঁড়লেন
সে চুপ থাকা বজায় রেখেই গায়ে মেখে নিল
আগামীকাল আপনি তার ডাল ভাঙবেন
সে হয়তো দাঁতে দাঁত চেপে চুপ থাকবে

 

শান্ত মানুষ গাছের মতো
কিন্তু পুরোপুরি গাছ হয়ে উঠতে পারে না
ছিঁড়তে ছিঁড়তে ভাঙতে ভাঙতে পরশু যখন
তার শেকড় ধরে টান মারবেন আপনি
চিৎকারের ঝড় উঠবে
এমন লক্ষ লক্ষ শান্ত মানুষের ঝড়ে 
আপনার সাম্রাজ্য ভাঙতে সময় লাগবে কয়েক সেকেণ্ড

 

 

পাঠের বাইরে

 

যে আমি আলোয় হাঁটি রোজ
তাকে দিও রোদ-বৃষ্টি জামা,
তাকে নিয়ে ঘুরতে যেও
 অচিনপুরের মাঠে,
তুলোর মত হাওয়ায় ওড়াও তাকে
কিংবা, ফেলো জলে , যেমন নুড়ি পাথর। 

আসলে এসব আমি
তোমার পাঠে সেজেছি অক্ষর। 

তুমি পড়ো, আমায় যেমন খুশী পড়ো...

যে আমি অন্ধকারে নিখোঁজ,
যে আমি আরশিতে চুপকথা
তার জন্য সন্ধে আসুক একা
ক্লান্তি ঠোঁটে সব পাখি বাসায় ফিরুক ঠিক...

 

 

কী যেন বলতে চেয়ে

 

কী যেন বলতে চেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলাম...

হাওয়ায় ভাসছে মেঘলা রোদের গন্ধ,
দ্রুত সাইকেল চালিয়ে 
সেতুর ওপারে চলে যাচ্ছে মেরুণ টি-শার্ট...

কী যেন বলতে চেয়েছিলাম ভেতর থেকে। 

বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে দেয়ালের আঁক,
জলে ছিপ ফেলে রেখে কেউ
টোপের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক

ভেতর থেকে কিছু বলতে চেয়ে 
এসে দাঁড়িয়েছিলাম মাছের পাখনায়

রূপোলী একজন্ম।  

 

 

পরিবর্তন

 

নেড়ি কুত্তার মত ভুখা এবং ধূসর দিন
কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে দরজার পাশে
বাইরের দেয়ালে অস্পষ্ট হয়ে আসা সাবানের বিজ্ঞাপনী রঙ মুছে
পাঁচ আঙুলের শিল্পে ফুটে উঠছে ডিটারজেন্টের নতুন ইস্তেহার

প্রাগৈতিহাসিক উঠোনে ঝলসানো রোদ কাঁধে 
এখনও পিতামহের গায়ের গন্ধ ছড়াচ্ছে প্রাজ্ঞ তমাল ছায়া

আর, মরা নয়ানজুলির পাশ দিয়ে রূপকথা রঙ রাস্তা 
হেঁটে গেছে দূরে.... দিগন্ত পেরিয়ে
এই রাস্তা দিয়েই একদিন আমি আশ্চর্য প্রদীপ হাতে বাড়ি ফিরবো 
আঁচলে এই প্রত্যাশা বেঁধে
গ্রীষ্মের নিদাঘ দুপুরে বাড়ির চৌকাঠে শরতের মেঘ আঁকছেন মা

 

 

মোড়

 

প্রতিটি গ্রাম্য রাস্তার মাঝে মাঝে
সবুজ পানপাতায় মোড়া এলাচ ও খয়েরের গন্ধময়
একটি করে মোড় থাকে,
টিউশান ফেরৎ সর্ষেফুলরঙের স্কার্টের গায়ে
ভোঁ ভোঁ করে এসে বসে 
কাজলকালো যুবক-মেঘের অপেক্ষা সংগীত

তারপর বৃষ্টি হয় অনেকক্ষণ....

ষাট ছুঁই ছুঁই নীরেন পোদ্দার গরম চায়ে ফুঁ দিয়ে
উপস্থিত সকলকে খুলে দেখায়
কবেকার কোন মাঠে কুড়িয়ে পাওয়া
আশ্চর্য এক সোনার প্রজাপতি, 
যাকে দেখার জন্য তখন সকলের হাতে হাতে জ্বলে
একমাত্র দেশলাই কাঠির নীল আগুন

কোমরে ব্যথা নেই, বাড়ি বন্ধক রেখে লোন নেই,
দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির ঘোড়া শুয়েই ঘুমিয়েছে 

প্রতিটি গ্রাম্য রাস্তার মাঝে মাঝে
এমনি করেই একটি করে মোড় বেঁচে থাকে

বৃষ্টিশেষে যেখান থেকে রাস্তাগুলো 
হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যায় কুয়াশাভরা গুটিপোকার দিকে...

 

 

লেখকের অন্যান্য লেখা

মহুল ওয়েব প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যা



করোনা Diary



আমাদের কথা

আমাদের শরীরে লেপটে আছে আদিগন্ত কবিতা কলঙ্ক । অনেকটা প্রেমের মতো । কাঁপতে কাঁপতে একদিন সে প্রেরণা হয়ে যায়। রহস্যময় আমাদের অক্ষর ঐতিহ্য। নির্মাণেই তার মুক্তি। আত্মার স্বাদ...

কিছুই তো নয় ওহে, মাঝে মাঝে লালমাটি...মাঝে মাঝে নিয়নের আলো স্তম্ভিত করে রাখে আখরের আয়োজনগুলি । এদের যেকোনও নামে ডাকা যেতে পারে । আজ না হয় ডাকলে মহুল...মহুল...

ছাপা আর ওয়েবের মাঝে ক্লিক বসে আছে। আঙুলে ছোঁয়াও তুমি কবিতার ঘ্রাণ...