Mohool Potrika
Login Here  Login::Register

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা



pracchad2

প্রচ্ছদ – সন্দীপ দে

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা



Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে দাসপুরের শ্যামগঞ্জ ।। বঙ্কিম দে
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
স্বাধীনতা আন্দোলনে চন্দ্রকোণা : ১৯০৫-১৯৪২ খ্রী : ।। গণেশ দাস
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
কুখ্যাত ডগলাসের হত্যাকারী মহান বিপ্লবী প্রভাংশুশেখর পাল ।। নিখিলেশ ঘোষ
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
স্বাধীনতা আন্দোলনে নাড়াজোল রাজপরিবার ।। দেবাশিস ভট্টাচার্য
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
স্বাধীনতা আন্দোলনে ঘাটাল মহকুমার জমিদার ও সামন্তদের ভূমিকা ।। দেবাশিস কুইল্যা
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা ।। উমাশঙ্কর নিয়োগী
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
ঘাটাল মহকুমার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ।। অশোক পাল
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী শহীদ প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য ।। নিখিলেশ ঘোষ
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
স্বাধীনতা আন্দোলনে চেঁচুয়ার হাট ও মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ।। দুর্গাপদ ঘাঁটি
Card image

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা
ঐতিহাসিক ফাঁসিডাঙা ।। পুলক রায়

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী শহীদ প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য ।। নিখিলেশ ঘোষ

pracchad2


"We are determined Mr burge not to allow any European to remain at Midnapore .yours is the next turn .Get yourself ready. I am not afraid of death .

Each drop of my blood will give birth to hundreds of Pradyots in all houses of Bengal. Do your work please

        ফাঁসির রজ্জু গলায় পরার আগে যিনি দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন এই অমোঘ ভবিষ্যৎবাণী তিনি আর কেউ নন দাসপুরের অখ্যাত গ্রাম গোকুলনগরের  প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্য। ইংরেজি ১৯১৩ সালের ৩রা  নভেম্বর বাংলা ১৩২o সালের ১৭ই কার্তিক সোমবার এক  রাতে পন্ডিত ভবতারণ ভট্টাচার্যৈর বসত বাড়িতে পত্নী পঙ্কজিনী দেবীর কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন এক পুত্র সন্তান  প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্য। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত্রি নটা বেজে ৪৮ মিনিট। ভট্টাচার্য বাড়িতে বেজে উঠলো মঙ্গলশঙ্খ যার আওয়াজে ধ্বনিত হয়েছিল এক মৃত্যুঞ্জয়ীর আগমন বার্তা। পরিবারের সকলের মধ্যে কনিষ্ঠ হওয়ায় প্রদ্যোতের ডাকনাম হোল কচি।

agni1

         প্রদ্যোৎ কুমারের দাদু ঈশাণ চন্দ্র ভট্টাচার্য বিদ্যালংকার ছিলেন একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি। তিনি সংস্কৃত সাহিত্য ন্যায় এবং দর্শনে  ছিলেন সুপণ্ডিত এবং নাড়াজোলের রাজা নরেন্দ্রলাল খানের দরবারে সভা পণ্ডিত। পিতা ভবতারণ ভট্টাচার্য ছিলেন ইংরেজি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত। তিনি ব্রিটিশ সরকারের রেভিনিউ এজেন্ট ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রদ্যোতের পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান।

প্রদ্যোৎ কুমারের শৈশব কেটেছে গোকুলনগর গ্রামে। এখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল। গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে কংসাবতী নদী। কখনো শান্ত কখনো ভয়ংকরী কংসাবতীর রূপ গ্রামের সবুজ শ্যামলী মা ভাই বোনেদের অফুরান ভালোবাসার মধ্যে প্রদ্যোৎ শৈশব কাটিয়েছেন স্বগৃহে গোকুল নগরে। পিতা তাঁর কর্মস্থল মেদিনীপুর শহরের অলিগঞ্জে তাঁর মাতুলালয়ের কাছে একটি বাড়ি কিনে বসবাস করতে থাকেন। সেই সূত্রে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরেই প্রদ্যোৎকেও মেদিনীপুরে চলে আসতে হলো। তখন তাঁর বয়স পাঁচ কি ছয়। ভর্তি হলেন হার্ডিঞ্জ মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে। মেদিনীপুরে আসার কয়েক বছরের মধ্যেই ১৯২৩ সালে পরিবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আকস্মিকভাবে মৃত্যু হল পিতা ভবতারণ ভট্টাচার্যের। তখন প্রদ্যোতের বয়স মাত্র ১০।একদিকে পিতাকে হারানোর দুঃখ অন্যদিকে সংসারের অঘটন অনাটন তাঁর শিশু মানে গভীরভাবে ছাপ রেখে যায়। মাতা পঙ্কজিনী দেবীও অসহায় অবস্থায় মেদিনীপুরে চলে আসেন। মায়ের বিষাদ মলিন মুখ তাকে ব্যথিত করত। পড়াশোনায় প্রদ্যোৎ বরাবরই ভালো ছিলেন। পরীক্ষায় ফলাফল ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। প্রদ্যোৎ বরাবরই ছিলেন শান্ত নিরীহ ও ধীর  স্থির এবং সকলেরই প্রিয়। ‌তিনি ছিলেন মিতবাক সংযমী এবং নিয়মানুবর্তী। নিজের এবং সংসারের কাজ সেরে যেটুকু সময় পেতেন তা নষ্ট না করে পড়াশুনাতেই বেশি মনোযোগ দিতেন। ইংরেজি ১৯৩০ সালে মেদিনীপুরের হিন্দু স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেদিনীপুর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের ভর্তি হলেন। শুরু হলো  প্রদ্যোতের নূতন জীবন।

              স্বদেশ প্রেমের উন্মেষ

      প্রদ্যোৎ কুমারের পিতা ভবতারণ বাবু ছিলেন ব্রিটিশের রাজকর্মচারী তার পরিবারে কেউ কোনোদিন স্বদেশী করেননি। আপাতত শান্ত স্বভাবের প্রদ্যোৎ এই পরিবেশেই বড় হচ্ছিলেন বই ছিল তার নিত্য সংগী। তাই কি পরিবার কি আত্মীয়-স্বজন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি এই নিষ্পাপ মুখশ্রী যুক্ত শান্ত ছেলেটির বুকের মধ্যে দেশমাতৃকার শৃংখল মোচনের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ জ্বলছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে দিনের পর দিন এই কিশোরের মনে জমা হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা যা পরে পরিণত হয়েছিল অগ্নিবর্ষী দাবানলে। মাতা পঙকজিনী দেবীকেও তিনি বুঝতে দেন নি যে তিনি বিপ্লবী দলে নাম লিখেছেন।

প্রদ্যোতের কিন্তু স্বদেশপ্রেমের উদ্ভব হয়েছিল শৈশবেই। তখন তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর।১৯২০ সাল। গান্ধীজীর ডাকে শুরু হয়েছে অসহযোগ আন্দোলন। আসমুদ্র হিমাচল নড়ে উঠেছে গান্ধীজীর ডাকে।  বিদেশি সবকিছুই বর্জন করা হলো। আন্দোলনের ছোঁয়া লাগলো মেদিনীপুরে। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধী মেদিনীপুর এলেন এবং মেদিনীপুরবাসিকে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিলেন। প্রদ্যোতের পিতা ভবতারণ বাবুও গান্ধীজীর আহবানে সাড়া দিয়ে বিদেশি দ্রব্য বয়কট করলেন। ওই সময় পরিবারের প্রত্যেককে একটি করে খদ্দর এর কাপড় উপহার দেন। বালক প্রদ্যোতের চোখে মুখে ফুটে উঠে এক অপরিসীম আনন্দ ও তৃপ্তির রেখা। ছোটবেলা থেকেই প্রদ্যোৎ শুনেছেন শহীদ ক্ষুদিরাম এবং শহীদ সত্যেনের বীরগাথা। মেদিনীপুর যে বিপ্লবের তীর্থভূমি ‌। এখানে পাইক বিদ্রোহ, চুয়াড় বিদ্রোহ ,সাঁওতাল বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ প্রভৃতির মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধভাবে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। প্রদ্যোতের  বাড়ির খুব  নিকটেই বাস করতেন শহীদ ক্ষুদিরামের দিদি অপরুপা দেবী। প্রদ্যোৎ নিয়মিত সেখানে যেতেন এবং অপরূপা দেবীর কাছে বারবার শুনতে চাইতেন শহীদ ক্ষুদিরামের গল্প। অপরূপা দেবী ও প্রদ্যোতের কাছে মন উজাড় করে বলতেন তার ভাই ক্ষুদিরামের বীরগাথা। প্রদ্যোত তন্ময় হয়ে সেই গল্প শুনতেন আর গুনগুন করে গাইতেন সেই বিখ্যাত গান- একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি/হাসি হাসি পরবো ফাঁসি, দেখবে ভারত বাসী।



             অগ্নিযুগের প্রথম পর্ব

         ১৯০১ সালে মেদিনীপুরে বার্জ টাউনে জাতীয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন কে কেন্দ্র করে মেদিনীপুর জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলো ।১৯০২ সালে বরোদা থেকে মেদিনীপুরে এলেন শ্রী অরবিন্দ ঘোষ। অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঋষি রাজনারায়ণ বসুর দৌহিত্র । শ্রী অরবিন্দ ছিলেন চরমপন্থার সমর্থক। তাঁর আগমনে মেদিনীপুরে চরমপন্থা বিস্তার লাভ করল‌। ইতিমধ্যে জ্ঞানেন্দ্র নাথ বসুর উদ্যোগে মেদিনীপুরে তৈরি হয়েছে একটি গুপ্ত সমিতি। হেমচন্দ্র কানুনগো, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর আন্তরিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠল কয়েকটি ব্যায়ামাগার যা পরে বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এই সময় মেদিনীপুরের বিপ্লবীরা কয়েকটি দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড ঘটায়। ১৯০৬ সালেই হেমচন্দ্র কানুনগোকে বোমা তৈরির কলাকৌশল শেখার জন্য ইউরোপে পাঠানো হয়েছিল। ১৯০৭ সালে মেদিনীপুরের নারায়নগড়ে বাংলার ছোট লাট ফ্রেজারের ট্রেন ধ্বংস করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল বিহারের মজঃফরপুর হেমচন্দ্রের ভাব শিষ্য ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়ির পরিবর্তে ভুলবশত মিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও কন্যার গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেন মিসেস এবং মিস কেনেডি নিহত হন। শেষ পর্যন্ত প্রফুল্ল চাকী নিজের গুলিতে শহীদ হন এবং ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। মেদিনীপুরের বিপ্লবী গুরু সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং কানাইলাল দত্ত রাজ সাক্ষী নরেন গোসাইকে হত্যা করেন। জেলের মধ্যেই তাঁদের ফাঁসি হয়। অপরদিকে মুরারি পুকুর বোমা মামলায় বারীন্দ্র ঘোষ, উল্লাস কর দত্ত প্রভৃতি অনেকের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়। অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম পর্ব এই ভাবেই ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় কিন্তু শহীদদের আত্ম বলিদান কখনোই ব্যর্থ হয়নি। তাঁরা পরবর্তী অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনে যে প্রেরণা এবং উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলেন তা মেদিনীপুরের অগ্নিযুগের দ্বিতীয় পর্যায়ের বিপ্লবী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং এই পর্বেই প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্যের আবির্ভাব ঘটেছিল।



অগ্নিযুগের দ্বিতীয় পর্ব ও প্রদ্যোৎ কুমার

অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতার ফলে মেদিনীপুরেও হতাশা নেমে এসেছিল। কিন্তু মেদিনীপুর বরাবরই ছিল চরমপন্থা এবং বিপ্লবী আন্দোলনের পীঠস্থান। তাই পুনরায় মেদিনীপুরের গুপ্ত সংঘগুলি জেগে উঠলো। ১৯২৭ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র ত্রিপাঠির প্রচেষ্টায়। মেদিনীপুরে গড়ে উঠলো ঢাকা মুক্তিসংঘ বা বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর মেদিনীপুর শাখা। সঙ্গে যোগ দিলেন পরিমল রায়, হরিপদ ভৌমিক, ফনীভূষণ কুন্ডু।

 তাঁরা মেদিনীপুরে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স বা বি ভির একটি গুপ্ত শাখা গঠন করলেন। এই সময়তেই ১৯২৭ সালের মাঝামাঝি ঢাকা থেকে মেদিনীপুরে এলেন ঢাকার মুক্তি সংঘ বা বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের  সদস্য বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। বস্তুত দীনেশের তেজোদীপ্ত রূপ প্রাণোচ্ছলতা, রবীন্দ্র প্রীতি , অসাধারণ বাগ্মিতা ও স্বদেশ প্রেম বিপ্লবীদের মনে আনল তীব্র উদ্দীপনা। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মেদিনীপুরের গুপ্ত সমিতি কলকাতার কেন্দ্রীয় সমিতির এক বিশিষ্ট শাখায় পরিণত হলো। এখানে নাড়াজোল এর জমিদার দেবেন্দ্র লাল খান কর্নেলগোলায় কাছারি বাড়ির একটি ঘর যুব সংঘের জন্য ছেড়ে দেন এবং আর্থিক সাহায্য দান করেন। কলকাতার কেন্দ্রীয় সমিতিও এই শাখা সমিতিকে গোপনে অস্ত্রশস্ত্র, উপদেশ, যুক্তি, পরামর্শ এবং উৎসাহ দিতে লাগলো । মেদিনীপুরের প্রায় সমস্ত যুব বিপ্লবীরা বি ভি র সদস্য হতে লাগলো। এদের মধ্যে ছিলেন পরিমল রায়, প্রফুল্ল ত্রিপাঠী, ফণীভূষণ কুন্ডু, হরিপদ ভৌমিক, জ্যোতি জীবন ঘোষ, বিমল দাশগুপ্ত, রামকৃষ্ণ রায় ,নির্মল জীবন ঘোষ ,অনাথ বন্ধু পাঁজা ,সুকুমার সেন, ভূপাল চন্দ্র পান্ডা এবং অবশ্যই প্রভাংশু কুমার পাল ও প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্য। ১৯৩০ সালে যে বছর প্রদ্যোৎ প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন সেই বছরই দীনেশের নির্দেশে মেদিনীপুরের গুপ্ত দলের পরিচালক ফনীন্দ্র কুমার দাস প্রদ্যোৎকে বি ভি র সদস্যপদ দিলেন। সেই দিন থেকেই প্রদ্যোৎ এর জপমালা হল ম্যাৎসিনির সেই বিখ্যাত বাণী -'your country should be your temple got at the summit a people of equals at the base "তোমার দেশ তোমার মন্দির হোক। তার চূড়ায়  থাকুন দেবতা। তার ভিত্তি হোক সাম্য সুখী জনতা।" বিপ্লবী হতে গেলে সর্বপ্রথম দরকার শরীরকে সুগঠিত করার এবং শৃঙ্খলার মধ্যে জীবনকে বেঁধে ফেলা।  শুরু হলো  প্রদ্যোৎ এর শরীরচর্চা সকালে ও সন্ধ্যায় নিয়মিত। তিনি ব্যায়াম চর্চা করতেন এবং পরিমিত পুষ্টিকর আহার করতেন। এ বিষয়ে প্রদ্যোৎএর বন্ধু প্রভাংশুশেখর পাল বিস্তৃত তথ্য দিয়েছেন। প্রদ্যোৎএর বাড়ির পাশেই ছিল দলের অপর বিশ্বস্ত কর্মী প্রভাংশু শেখর এর বাড়ি। প্রভাংশু রাত্রে বাইরের ঘরে শয়ন করতেন এবং শোয়ার সময় তার পায়ে একটি দড়ি বেঁধে রাখতেন দড়ির অপর প্রান্তটি বাঁধা থাকতো জানলার সিকের সঙ্গে। প্রতিদিন ভোর চারটের সময় প্রদ্যোৎ এসে জানলার দড়ি ধরে টান দিতেন। প্রভাংশুকে জাগাবার জন্য প্রভাংশুর ঘুম ভেঙে যেত। অসম্ভব পাংচুয়াল ছিল। কোন সময় একদিনের জন্যেও এই নিয়মের এতোটুকু বিচ্যুতি ঘটেনি।

কলেজের পাঠ্য পুস্তকের বাইরে প্রদ্যোত পড়তেন নানা দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস- ইতালি, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, চীন, জাপান ও আমেরিকার ইতিহাস, শিবাজী ,গ্যারিবল্ডি, কামাল পাশা, লেনিন ,ক্ষুদিরাম। স্বামী বিবেকানন্দের রচনা ,অশ্বিনী দত্তের ভক্তিযোগ, সখারাম দেবস্করের দেশের কথা ,রমেশ দত্ত, বিপিনচন্দ্র পাল, সুরেন্দ্রনাথ, বালগঙ্গাধর তিলক, লাজপথ রায় এর লেখাও তিনি পড়তেন। তাছাড়া গান্ধীজীর ইয়ং ইন্ডিয়া এবং বিপ্লবীদের মুখপাত্র বেনু ও স্বাধীনতা এই দুটি কাগজও তাঁর অবশ্য পাঠ্য ছিল। এছাড়াও শরৎচন্দ্রের পথের দাবী বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ রবীন্দ্রনাথের গোরা প্রভৃতি বইগুলিও নিয়মিত পড়তেন এবং এই ভাবেই তৈরি করে তুলেছিলেন নিজেকে একজন যথার্থ বিপ্লবী হিসাবে।

 

agni2

        বিপ্লবের পথে যাত্রা

অগ্নিগর্ভ ১৯৩০ সাল পুনরায় ঝড়ের সংকেত নিয়ে এলো। গান্ধীজীর ডান্ডিতে লবণ আইন ভঙ্গ কে কেন্দ্র করে যে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হলো তা মেদিনীপুরেও এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা সৃষ্টি করল। ব্রিটিশ সরকার এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অত্যাচারের স্রোত বইয়ে দিল। চূড়ান্ত প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো নিরস্ত্র নরনারীর উপর। পৈশাচিক অত্যাচার চলতে লাগলো তাদের উপর। বিপ্লবীরা বুঝলেন এই সমস্ত অত্যাচারী শাসকদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। এই সময়তে ১৮ ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব যুব বিদ্রোহ ঘটলো। ২৫শে আগস্ট কলিকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার টেগার্ট সাহেবের উপর বোমা বর্ষিত হল। ২৯শে আগস্ট ঢাকায় পুলিশ কমিশনার লোম্যানকে হত্যা করে মেডিকেল কলেজ এর ছাত্র বিনয় বসু গা ঢাকা দিলেন। ওই বছরই ডিসেম্বর মাসের আট তারিখে রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান করলেন  তিন বাঙালি যুবক বিনয় বসু ,বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত। হত্যা করলেন কারাধ্যক্ষ সিম্পসন সাহেব কে । শেষ পর্যন্ত বাদল গুপ্ত সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করলেন। বিনয় বসু মেডিকেল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। কিন্তু দিনেশ ধরা পড়ে গেলেন। বিচারে তাঁর ফাঁসি হলো। মেদিনীপুর এর বিপ্লবীরা চুপ করে বসে থাকলেন না। মেদিনীপুরের জেলাশাসক ছিলেন অত্যন্ত অত্যাচারী ও নৃশংস‌ ।তিনি জুতোর তলায় বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বিপ্লবীদের উপরে চাবুকের ঘা, প্রহার, কারাদণ্ড বেত্রাঘাত ,ঘরে আগুন দেওয়া এবং নারী ধর্ষণ কিছুই বাদ যায়নি তার অত্যাচারের নির্ঘণ্ট থেকে।১৯৩১ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় বি ভির নির্দেশে ঠিক হলো মেদিনীপুর জেলার অত্যাচারের প্রতিমূর্তি এবং মাতৃ জাতির সম্মান ও সম্ভ্রম লুণ্ঠনকারী জেলাশাসক পেডিকে হত্যা করতে হবে। ১৯৩১ সালের ৭ই এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে বি ভির সক্রিয় সদস্য বিমল  দাশগুপ্ত জেলাশাসক পেডিকে হত্যা করেন। বিমল দাশগুপ্ত এরপর ছদ্মবেশে গা ঢাকা দেন কলকাতায়। পুলিশ শত চেষ্টা করেও তাঁকে ধরতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই হত্যার পরপরই মেদিনীপুরে অত্যাচারের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। অসংখ্য নিরস্ত্র মানুষ এবং বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করে হিজলি বন্দী শিবিরে আটক করা হয়েছিল  1931 সালের 17 ই সেপ্টেম্বর ঘটলো এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ।রাত সাড়ে নটায় হিজলী জেলে পাগলা ঘন্টি বেজে উঠলো। বন্দী নিবাসে ৫০ জন বন্দুকধারী পুলিশ এবং ২৫ জন লাঠি ও বেয়নেট ধারী সিপাহী প্রবেশ করে নিরীহ বন্দীদের উপরে গুলি চালালো। নিহত হলেন সন্তোষ কুমার মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। আহত হলেন অনেকে। পরের দিন সংবাদপত্রের পাতায় পশ্চিমবঙ্গের জনগণ দেখলেন সভ্যতার অপমৃত্যু। এই গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন পরবর্তী জেলাশাসক চার্লস ডগলাস।  তিনি পূর্ববর্তী জেলা শাসক পেডির চেয়ে কোন অংশে কম অত্যাচারী ছিলেন না। তিনিও মনে করতেন অহিংস সত্যাগ্রহী এবং বিপ্লবীদের সীমাহীন অত্যাচারের মাধ্যমে দমন করা যাবে  । হিজলি বন্দী শিবিরে ইংরেজদের নির্মম অত্যাচার বিপ্লবীদের প্রাণে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ডগলাসকে তার মিথ্যাচারের জন্য বিপ্লবী দল শাস্তি দান করতে সংকল্পবদ্ধ হলেন। তাই চার্লস ডগলাসও বিপ্লবীদের কাছে চিহ্নিত হয়ে গেলেন।কলিকাতার বি ভি কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে নির্দেশ এল জেলাশাসক ডগলাসকে হত্যা করতে হবে। দীনেশের সহকর্মী বীরেন ঘোষ দুটি রিভলবার নিয়ে মেদিনীপুরে এলেন ফনীন্দ্রনাথ দাস এই রিভলভার দুটি তুলে দিলেন প্রভাংশু শেখর পাল এবং প্রমথ  মুখার্জির হাতে। প্রথমে প্রদ্যোৎ একটু হতাশ হয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানতেন যে বিপ্লবীদের প্রশ্ন করতে নেই।

There's not to reason why

there's but to do and die.            কিন্তু ফনীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন যে প্রভাংশু আচরণে এত বড় যে অ্যাকশন নিতে যাচ্ছেন তার কোন চিহ্নমাত্র ছিল না  তাঁর গতিবিধি ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক।। প্রমথর মুখে ছিল টেনশনের ছাপ তাঁর গতিবিধিও অশান্ত এবং অস্বাভাবিক। তাই ফনীন্দ্রনাথ ঠিক করলেন যে প্রমথকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়া চলবে না এমন কাউকে দিতে হবে যিনি হবেন সংকল্পে দৃঢ় এবং পদক্ষেপে ধির শান্ত অথচ স্বাভাবিক। তাই শেষ পর্যন্ত প্রমথর পরিবর্তে প্রদ্যোৎ কুমারকেই এই কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হল। প্রদ্যোৎ এবং প্রভাংশু দুজনেই দৃঢ় কন্ঠে জানালেন যে তারা ডগলাসকে খতম না করে ফিরে আসবেন না। ধরা পড়লে অত্যাচার ফাঁসি বা দ্বীপান্তর হবে হলেও হাসিমুখে তা মেনে নেবেন। প্রদ্যোত কুমার খবর নিয়ে এলেন যে আগামী ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে মার্চ জেলা বোর্ডের মিটিং বসবে আর তাতে সভাপতিত্ব করবেন জেলাশাসক ডগলাস ।অ্যাকশন স্কোয়াডের প্রফুল্ল দত্তের নির্দেশ মত প্রদ্যোত এবং প্রভাংশু মার্চ মাসে  হত্যার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু ডগলাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতই সুদৃঢ় ছিল যে ডগলাস হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় প্রদ্যোত এবং প্রভাংশুর মনে কিছুটা হতাশার সৃষ্টি হলো কিন্তু তাঁরা হাল ছেড়ে দিলেন না । অবশেষে আবার খবর এলো পরের মাসে জেলা বোর্ডের সভা বসবে ৩০ শে এপ্রিল বিকেল পাঁচটায়। প্রদ্যোত চঞ্চল হয়ে উঠলেন। ওই দিন ডগলাসকে হত্যা না করতে পারলে আবার একমাস অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মাসে একবারই  ডগলাসকে বাংলোর বাইরে দেখতে পাওয়া যায়। প্রভাংশু কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। তার কাছে দ্রুত খবর গেল। প্রভাংশু ২৯ এ এপ্রিল মেদিনীপুরে ফিরে এলেন। স্টেশনে নেমেই প্রথমে গেলেন ফনীদ্র মোহন দাসের বাড়ি। মুরারির দা অর্থাৎ বি ভির কেন্দ্রীয় কমিটির সুপতি রায়  প্রভাংশুর হাতে ৩৮০ বোরের একটি রিভলবার ২৩ টি বুলেট এবং ৬০ টাকা দিয়েছিলেন প্রভাংশু সেগুলি ফনির হাতে তুলে দিলেন। উনি বললেন "আগামীকাল অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল সকাল আটটায় তুমি চলে এসো ওই দিন প্রদ্যোত আসবে আমার বাসায।" এরপর প্রভাংশু চলে গেলেন তার মামা অমলচন্দ্র বসুর বাড়ি, মামা অবাক হয়ে বললেন "কিরে চিঠিপত্র ছাড়াই হঠাৎ চলে এলি?"প্রভাংশু মামা মামীর পদাতধূলি নিয়ে বললেন" না জরুরী কাজ আছে।তাই এমনি চলে এলাম। তোমাদের দেখতে ইচ্ছে হলো।"

    ঐদিন সন্ধ্যায় ডায়মন্ড ক্লাবের এক নির্জন প্রান্তে প্রভাংশুর সঙ্গে প্রদ্যোতের দেখা হল। প্রদ্যোৎ নতুন নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন। প্রভাংশুর সঙ্গে কথা বলে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন কারণ সুপতিদার নির্দেশ ডগলাস অথবা রক্সবারকে খতম করতেই হবে। প্রদ্যোৎ প্রভাংশুর হাতে হাত রেখে বললেন," কাল আমরা ডগলাসককে হত্যা করবোই। "প্রভাংশু  তাতে সায় দিলেন।

 

agni3

         

               ডগলাস হত্যার দিন

৩০ এপ্রিল 1932 সাল। পূব আকাশে অন্যান্য দিনের মতোই সূর্য উঠল। তার সোনালী আলোয় রাঙা হয়ে উঠলো কংসাবতীর জল। শেষ রাতে ফনি চলে গেলেন কংসাবতীর দিকে। হাতে সুপতিদার সেই রিভলবার। সকাল আটটার আগেই বাড়ি ফিরে ফনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রথমে এলেন প্রদ্যোৎ পরে প্রভাংশু। একসঙ্গে বসেই তারা তিনজন পরিকল্পনা স্থির করে নিলেন। ঠিক হলো, দুজনেই মেকআপ নেবেন যাতে কেউ চিনতে না পারে, প্রভাংশ করলেন প্রদ্য স্থিতি কাটলেন অন্যদিকে। উভয়ই চোখে নিলেন একটি চশমার ফ্রেম দুজনেই মাল কোচা মেরে ধুতি পরলেন। চলাফেরার সুবিধার জন্য ক্যানভাসের জুতো পরলেন। পকেটে নিলেন ২৫ টি টাকা এবং সায়ানাইডের স্যাম্পুল আর দুজনেরই সঙ্গে থাকলো দুটি চিরকুট। একটিতে লেখা থাকলো হিজলীর "অত্যাচারীর ক্ষীণ প্রতিবাদ" অন্যটিতে লেখা "a fitting reply to  premeditated,prearranged barbarous and cowardly attempt on the patriotic sons of Bengal" Bengal Revolutionaries.

প্রদ্যোৎ কে দেওয়া হল বড় রিভলবার প্রভাংশু নিলেন সুপতিদার দেওয়া ছোট রিভলবারটি ‌  প্রদ্যোৎকে একটি অটোমেটিক পিস্তল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ফনি কিছুক্ষণ আগেই সেই পিস্তলটি মেদিনীপুরের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। যদি সেই পিস্তলটি থাকতো প্রদ্যোতের কাছে তাহলে হয়তো আজ ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। যাইহোক প্রদ্যোৎ বড় রিভললবার ও প্রভাংশু কলকাতা থেকে আনা ছোট রিভলবার নিয়ে নির্ভয়ে নিজে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয়ে গেলেন। প্রদ্যোতের মনে তখন মহাকালের আহ্বান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের কবিতা বারবার তিনি গুনগুন করে গাইছিলেন আর মনের অশান্তিকে এবং চঞ্চলতাকে দূর করার চেষ্টা করছিলেন।।

বেলা হলে পর প্রদ্যোৎ স্বাভাবিকভাবেই স্নান খাওয়া করলেন। শর্বরী এবং প্রদ্যোৎকে মা খেতে দিলেন। দুই ভাই পাশাপাশি বসে খেলেন তাদের শেষ খাওয়া। এরপর প্রদ্যোৎ গেলেন বিশ্রাম নিতে কারণ বিকেল চারটেতেই তাদের যাত্রা শুরু হবে আর তাদের অস্থি দিয়ে জ্বলবে স্বাধীনতার রক্ত সূর্য।

প্রদ্যোতের  ঘুম আসছিল না। বেলা চারটের আগেই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন মাঠে। প্রভাংশুর একটু দেরি হয়ে গেল তবুও তিনি প্রায় ঠিক সময়ে পৌঁছে গেলেন মাঠে। অপরদিকে ফনি দূর থেকে অকম্পিত চিত্তে সব প্রত্যক্ষ করেছিলেন। প্রদ্যোতের চোখে চশমা এবং সিঁথি অন্যদিকে কাটা হয়েছে অপরদিকে প্রভাংশুর মোটা গোঁফ মাল খোঁচা মারা ধুতি প্রভাংশুর চেহারাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। বিকেল চারটে বাজলো ডগলাস গাড়ি করে তার বাংলা থেকে বেরিয়ে দ্রুত ঢুকে গেলেন জেলা বোর্ডের ভবনে ।তিনি হয়তো কিছু আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। ফনি ইশারায় ডগলাসের আগমন বার্তা দুই বিপ্লবীকে দিয়ে পাশ দিয়ে সাইকেলে করে দ্রুত বার হয়ে গেলেন। কেউ ঘুনাক্ষরেও জানতে পারলেন না। এরপর ও প্রভাংশু অচঞ্চল চিত্তে জেলা বোর্ড কম্পাউন্ডের দিকে এগিয়ে চললেন। প্রথমে উত্তর পূর্ব দিকের গেটে। দুজন সশস্ত্র প্রহরী তাদের পথ আটকালো। তখন প্রদ্যোতরা গেলেন উত্তর-পশ্চিম গেটে। সেখানেও প্রহরীদের একই জবাব। হুকুম নেহি। প্রথমেই বাধা ! কিভাবে তারা সভাকক্ষে পৌঁছবেন। কিন্তু বিপ্লবীদের তো হতাশ হলে চলবে না ।অনেকদিন পরে সেই সুযোগ এসেছে কাজে লাগাতেই হবে। অন্য পথ খুঁজতেই হবে। তাই এবারে পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে লোহার তারের বেড়া ডিঙিয়ে তারা দুজনে দক্ষিণ দিকের বারান্দায় উঠলেন সেখানে কোন প্রহরী ছিল না। সেখান থেকে দেখা গেল সভাপতির পশ্চিমে দুপাশের দেওয়াল। অধিবেশন শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। ডগলাস সভাকক্ষেই আছেন। প্রহরীরা তাই নিশ্চিন্ত চিত্তে সভাকক্ষের বাইরে হালকা গল্প গুজবে ব্যস্ত। এমন সময় প্রহরীদের অজান্তে প্রদ্যোত ও প্রভাংশু ু ঝড়ের মতো ছুটে চলে যান তাদের পাশ কাটিয়ে একবারে ডগলাসের পিছন দিকে ডগলাস কিছু বুঝবার আগেই গর্জে উঠল রিভলবার।  দ্রুম  দ্রুম দ্রুম। ের টেবিলে একেবারে মাটিতে পড়ে গেলেন। এরপর প্রভাংশু প্রদ্যোতকে ফিসফিস করে বললেন," চল ছুটে পালাই। বলা মাত্র দুজনে প্রহরীদের পাশ দিয়ে  ঝড়ের গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় সভাপতক্ষে উপস্থিত প্রত্যেকেই তখন হতভম্ব। এই দুর্ভেদ্য দুর্গ ভেদ করে ওরা এলো কি করে? কিভাবেই বা ওরা ডগলাসের বুকে গুলি করে  ছুটে পালালো তা ভাবতে ভাবতেই প্রহরীদের কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। তারপর সম্বিত ফিরে পেতেই শুরু হল হইচই চিৎকার। ততক্ষণই তারা বুঝতে পেরেছে পাশ দিয়ে যে দুজন তরুণ ছুটে গেল তারাই মূল আসামি। চিৎকার করতে করতে ছুটে গেল বশির আলী, মোহাম্মদ আলী, চাপরাশি কেনারাম মুর্মু ম্যাজিস্ট্রেট  বিএন সেন এবং ঝাড় গ্রামের মিত্র গুলি ছুটতে ছুটতে তারা প্রভাংশুর দিকে ছুটে গেল। প্রভাংশু বুঝলেন আক্রমণ ই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে পরপর পাঁচটি গুলি করলেন। সিপাহীরা গুলির শব্দে থমকে গেল। তারা গুলি খাওয়ার ভয়ে আর অগ্রসর হলো না । সেই সুযোগে প্রভাংশু অমর লজের পাশের রাস্তা ধরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। পথে একটি  সাঁকোর তলায় রিভলবারটি পুঁতে রাখলেন এবং গোঁফজোড়া ফেলে দিলেন। সামনের পুকুরে ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে মামার বাড়ি গিয়ে সকলের সঙ্গে এমন ভাবে মেতে উঠলেন যে কেউ তাঁকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করল না।

    অপরদিকে প্রদ্যোতের ললাটে সেদিন দুর্ভাগ্য লেখা ছিল । প্ল্যানমাফিক প্রভাংশু যখন অমর লজের পিছন দিয়ে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলেন তখন প্রদ্যোত ছুটে গিয়েছিলেন দক্ষিণ দিকে সায়েন্স লজের  ঝোপের দিকে। প্রভাংশুকে ছেড়ে এখন প্রদ্যোতের পেছনে সেই দেহরক্ষী এবং চাটুকারের দল। তারা মুহূর্মুহু গুলি ছুঁড়ছিল। প্রদ্যোত ঘুরে দাঁড়িয়ে পাল্টা গুলি চালাতে চেষ্টা করলেন কিন্তু বিধি বাম। ট্রিগারে চাপ দিলেও গুলি বের হলো না। প্রদ্যোত তখন ছুটতে ছুটতে পোড়ো বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটি ঘরে ঢুকে পড়লেন। বাড়িতে তখন কোন কপাট ছিল না প্রদ্যোৎ চেষ্টা করলেন রিভলবারটি মেরামত করতে কিন্তু কোনভাবেই রিভলবারটিকে ঠিক করতে পারলেন না। এদিকে ইংরেজি সিপাহীরা দ্রুত প্রদ্যোতের দিকে এগিয়ে আসছিল তাদের উপর প্রদ্যোৎ আবার গুলি চালানোর চেষ্টা করলেন কিন্তু আবার ব্যর্থতা ।কোন গুলি বের হলো না যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে। প্রহরীরা তখন বুঝে গেছে প্রদ্যোতের রিভলবার কাজ করছে না। তারা দ্বিগুণ উৎসাহে প্রদ্যোতের দিকে এগিয়ে আসছিল বেগতিক দেখে প্রদ্যোত দৌড়ে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে সরু পথ দিয়ে ছুটে যেতে লাগলেন। পেছনে প্রহরীরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না হঠাৎ একটি তারের বেড়ায় তার কাপড় জড়িয়ে গেল এবং প্রদ্যোত মাটিতে পড়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে একটি শক্ত ইঁট ছুটে এসে লাগলো তার মুখে। পড়ে গেলেন প্রদ্যোৎ । সেই সুযোগে  বশির আলী প্রদ্যোতকে জাপটে ধরল। তারপর। তারপরের ইতিহাস ঘাতকের হাতে সভ্যতার অপমৃত্যুর ইতিহাস। মানবতার পরাজয় এবং হিংস্রতা নিশংসতা ও বর্বরতার জয়ের ইতিহাস। বশির আলী মোহাম্মদ আলীরা পৈশাচিক উল্লাসে উন্মত্তের মতো প্রদ্যোতকে প্রহার করতে লাগলো। অমানুষিক প্রহারে জর্জরিত হয়ে প্রদ্যোত অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তখন সেই বিধ্বস্ত শরীরটাকে জোর করে জঙ্গল থেকে টেনে হিঁচড়ে বার করা হলো। প্রদ্যোতের শার্টের ডান দিকে পাওয়া গেল একটি লেখা ও বুক পকেটে একটি রুমাল ও মানিব্যাগ। মানি ব্যাগে ছিল ২২ টাকা। খানমর মধ্যে এক টুকরো কাগজ পাওয়া গেল। তাতে লাল রঙে লেখা রয়েছে fitting reply to the pre meditated prearranged barbarous and cowardly  attempt on the patriotic sons of Bengal." Bengal Revolutionaries. অপরটিতে লেখা রয়েছে "হিজলি হত্যার ক্ষীন প্রতিবাদ। ইহাদের মরনেতে ব্রিটেন জানুক আমাদের আহুতিতে ভারত জাগুক বন্দেমাতারম।"



ডগলাস হত্যা পরবর্তী মেদিনীপুরে দমন নীতি

অবশ্যই  ডগলাসবুলেট বিদ্ধ হয়েও কিছু সময়ের জন্য বেঁচে ছিলেন। রাত্রি ৯টায় ডগলাসের ভবলীলা  সাংগ হল।

ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা শহরে। শহরের প্রতিটি রাস্তা ,রেলওয়ে স্টেশন, নদীর ঘাটে সর্বত্রই কড়া পাহারা বসে গেল ।এক অজানা আশঙ্কা এবং আতঙ্কে ভীত ও উৎকণ্ঠিত হয়ে মেদিনীপুরের নাগরিকরা প্রতীক্ষা করতে লাগলেন। রাত্রেই শুরু হয়ে গেল  পুলিশি তান্ডব।ঘরে ঘরে পলাতকের সন্ধানে খানা তল্লাশি শুরু হলো। উম্মতের মতো সিপাহীরা ঘর থেকে বাক্স তরঙ্গ আলমারি আসবাবপত্র মাটিতে আছড়ে ফেলতে লাগলো ‌। রান্না ঘর থেকে ছড়িয়ে ফেলল হাঁড়ি কলসি গোপন অস্ত্র এবং নিষিদ্ধ বিপ্লবী কাগজের সন্ধানে প্রত্যেক বাড়ি তারা তছনছ করতে লাগলো। স্বাভাবিকভাবেই এই অত্যাচারের হাত থেকে প্রদ্যোৎকুমারের আত্মীয়  রাজভক্ত উকিল খীরোদ চন্দ্র চক্রবর্তীর বাড়িও রক্ষা পেল না। তন্ন তন্ন করে গাড়ির প্রতিটি ঘর রান্নাঘর টয়লেট সব খোঁড়াখুঁড়ি।হলো। তছনছ করে দেওয়া হলো। কিন্তু কোথাও অস্ত্রশস্ত্র বা আপত্তিকর কাগজপত্র কিছুই পাওয়া গেল না। র পঙ্কজীনীদেবীকেও পুলিশ জিজ্ঞেস করল ।প্রদ্যোত  কোথায়? কিন্তু   তিনি বললেন   জানিনা ।তখন প্রদ্যোতের অপর ভাইদের না পেয়ে ঠিক উপরের ভাই শর্বরীভূষণকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে শর্বরীভূষণের  উপর অমানুসিক অত্যাচারে শর্বরীভূষণের পাগল হয়ে গেল তার শেষ পর্যন্ত স্থান হলো রাঁচি পাগলা গারদে।



জেলে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা এবং অমানুষিক অত্যাচার

         এদিকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য প্রদ্যোতের উপর শুরু হলো অমানবিক এবং পাশবিক নির্যাতন নারায়ণগড় থানা থেকে আনা হলো কুখ্যাত দারোগা রাহাত বক্স চৌধুরী। তিনি প্রদ্যোতকে প্রশ্ন বাণে বিদ্ধ করলেন। কিন্তু প্রদ্যোত নিশ্চুপ। বিপ্লবের প্রথম শিক্ষা যে মন্ত্রগুপ্তি তা তিনি কখনোই ভঙ্গ করবেন  না।বিপ্লবী দের পালন করতে হত অরবিন্দ ঘোষের বিখ্যাত বাণী- Be rare in your acquaintances . Seal your lips to rigid secrecy. Don't breathe this to your nearest and dear

ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন নিরীহ পশুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি রাহাত বক্স কোন উত্তর না পেয়ে প্রদ্যোতোর উপর শুরু করল অমানুষিক নির্যাতন ।নখের মধ্যে পিন ফোটানো ,বরফের চাঁইয়ের মধ্যে চেপে রাখা, লঙ্কার ধোঁয়া দেওয়া, চেইন দিয়ে প্রহার, মুখে জোর করে প্রস্রাব ঢালা ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ গেল না। অবশেষে প্রহারে অত্যাচারে  জর্জরিত, অবসন্ন, রক্তাক্ত প্রদ্যোত জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

৩রা মে ১৯৩২ । প্রদ্যোতের দাদা প্রভাত ভূষণকে থানায় নিয়ে আসা হলো। প্রদ্যোতের অবস্থা দেখে প্রভাতভূষণ চমকে উঠলেন! একি চেহারা হয়েছে প্রদ্যোতের! সেই সুদর্শন গৌরবর্ণ সুন্দর ছেলেটির সারা মুখ ফুলে উঠেছে। চোখ দুটি কোটরাগত। প্রভাতভূষণের  মনটা হু হু করে উঠল।এদিকে পঙ্কজিনী দেবী প্রদ্যোতের চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বিছানা শয্যা নিয়েছেন। ভূপেন দারোগা প্রদ্যোতকে নানা রকম প্রলোভন দিলেন । কিন্তু প্রদ্যোতের  একই কথা। তিনি যা বলেছেন তার বেশি আর কিছু জানেন না। শেষ পর্যন্ত ভূপেন দারোগা প্রদ্যোতের রিভলবার নিয়ে ব্যঙ্গ করতে লাগলেন। তখন দুই হাত কপালে ঠেকিয়ে জ্বলে উঠে প্রদ্যোত বললেন irony of fate Bhupen Babu. Had my revolver spoken out I would not have been here and in this condition the story would have been otherwise.. প্রদ্যোতের এত বড় আস্পর্দা দেখে ভূপেন বাবু চিৎকার করতে করতে বললেন "এত মার খেয়েও তোর শিক্ষা হয়নি ?"এই বলে প্রহার করতে করতে সজোরে টানতে টানতে আবার জেল কুটুরির ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন। প্রভাত ভূষণ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাড়ি ফিরে এলেন।

প্রদ্যোতের কাছে স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পেরে অন্য পথ ধরলেন। ঘটনার দিনই পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে  গিয়েছিল ফনীও নরেন দাসকে এবং প্রদ্যোত, নরেন এবং ফনির উপর পালা করে অকথ্য অত্যাচার চলতে লাগলো। সকলেরই শরীর ক্ষতবিক্ষত হল কিন্তু তবু কেউ মুখ খুললেন না। ৪ঠা মে ফনীকে  আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হলো। অবশেষে সহকর্মীদের নৃশংস অত্যাচার থেকে বাঁচানোর জন্য। প্রদ্যোত স্বীকারোক্তি দিতে সম্মত হলেন যদিও তিনি মিথ্যা বিবৃতি দিলেন এবং বললেন আমহার্স্ট স্ট্রিটৈ সিতাংশু দা বলে এক ব্যক্তি তাকে রিভলবার দেন এবং তাই দিয়ে তিনি ডগলাসকে হত্যা করেন।

পুলিশ  সিতাংশু দা নামে কাউকে না পেয়ে সীতাংশুর দাদা প্রভাংশুকে ধরেছিল কিন্তু পুলিশ শত চেষ্টা করেও কোন ভাবেই প্রভাংশুকে দোষী বলে প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে প্রমাণের অভাবে প্রভাংশু সহ সকলকেই মুক্তি দিয়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশ একমাত্র প্রদ্যোতের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করলো।



        স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের রায়

৯ই জুন ১৯৩২ সাল স্পেশাল ট্রাইবুনালের আদালতে শুরু হলো প্রদ্যোতের বিচার। মামলা যখন চলছে তখন প্রদ্যোতের বন্ধুরা নিশ্চিষ্ট হয়ে বসে ছিলেন না তারা ঠিক করলেন প্রদ্যোতকে যখন জেলখানা থেকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে বা কোর্ট থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সেই সময় জনবিরল পথে প্রহরীদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করে মুক্ত করা হবে।এই কাজে অবশ্যই প্রদ্যোতের সমর্থন চাই। তাই তারা প্রদ্যোতের কাছে এ ব্যাপারে গোপন চিঠি পাঠালেন কিন্তু প্রদ্যোতের পক্ষে যে সমস্ত ব্যারিস্টার এবং আইনজীবী দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের অভিমত হলো মামলায় প্রদ্যোতের অবস্থান খুব ভালো। ভালোভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রদ্যোতের গুলিতে ডগলাস মরেন নি সুতরাং প্রদ্যোতের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হলেও তার ফাঁসি হবে না অতএব এই অবস্থায় এই ধরনের ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হবে? কিছুদিনের মধ্যেই প্রদ্যোতের গোপন চিঠি এলো বিপ্লবীদের কাছে," এত বড় ঝুঁকি তোমরা কিছুতেই নিও না। এই ধরনের অ্যাকশনে তোমাদের অনেকের জীবন বিপন্ন হবে ।যাই ঘটুক না কেন তার জন্য আমার মনে এতটুকু খেদ  ও দুঃখ নেই। আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতে আমি সর্বদা প্রস্তুত।" প্রদ্যোতের অসম্মতিতে প্রভাংশু ও ব্রজ কিশোর তাদের পরিকল্পনা ত্যাগ করলেন।বস্তুত প্রদ্যোতের কাছে তার জীবনের চেয়ে বন্ধুদের জীবন ছিল অনেক বড়।।

     

      বিচারকদের রায়ে মতপার্থক্য

    তিনজন বিচারককে নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল তাদের রায় ঘোষণা করলেন। অপরাধ নির্ণয়ে বিচারকদের মধ্যে মতপার্থক্য না হলেও শাস্তি সম্পর্কে তাদের মতপার্থক্য দেখা দিল। বিচারপতি মিস্টার কে সি নাগ ও মিস্টার ভুজঙ্গধর মুস্তাফির মতে আসামীগুরুতর অপরাধে অপরাধী। ফাঁসি তার একমাত্র শাস্তি। অপরদিকে মিস্টার জ্ঞানাঙ্কুর দে র  মতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দ্বীপান্তর ই যথেষ্ট। তিনি কারণ হিসাবে জানালেন আসামির বয়স মাত্র 18 বছর। তাছাড়া এটা নিঃসন্দেহে জানা গেছে যে আসামির রিভলবার থেকে একটি গুলিও বের হয়নি ৩৮০ বোরের গুলিতে মিস্টার ডগলাসের মৃত্যু হয়েছে। অথচ আসামির কাছে ছিল ৪৫০ বোরের রিভলবার। সুতরাং হত্যার জন্য আসনে গৌণতো দায়ী হলেও মুখ্যত দায়ী নয় এরকম অবস্থায় বিভিন্ন হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে লঘুদন্ডের ব্যবস্থা করেছেন এমন নজির আছে।  কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত আসামি প্রদ্যোতের কুমার ভট্টাচার্য কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।

বিচারকদের রায় শুনে অপেক্ষারত বিশাল জনতা খুবই দুঃখ বেদনায় চঞ্চল হয়ে উঠল। তারা জয়ধ্বনি দিল প্রদ্যোতের। সমবেত জনতা শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা জানালেন বিচারক মিস্টার জ্ঞানাঙ্কুর দে কে।অপরদিকে মিস্টার বিচারক কে সি নাগ এবং মিস্টার মুস্তাফি জনতার সেম সেম ধোনির মধ্যে নতমুখে মোটরে উঠলেন এবং ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে রইলেন।



                 মৃত্যুদন্ড বহাল

স্বাভাবিকভাবেই প্রদ্যোতের আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব কেউই এই রায় মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা ঠিক করল যে হাইকোর্টে আপিল করবে।।  প্রদ্যোত কোনোভাবেই চাননি হাইকোর্টে আপিল করতে। কিন্তু আত্মীয়রা  বললেন" মায়ের শেষ ইচ্ছে আপত্তি করোনা।" প্রদ্যোৎ বললেন "ঠিক আছে. মায়ের ইচ্ছা যখন আপত্তি করব না. তবে আমার মন বলছে তাঁর আশা পূর্ণ হবে না।" ৩০ শে জুন ১৯৩২ এ হাইকোর্টে আপিল রুজু করা হলো। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও বাইশে আগস্ট হাইকোর্ট স্পেশাল ট্রাইবুনালের রায়কেই সমর্থন করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখল। রায় বের হলে সারাদেশে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে দেখা দিল তীব্র ক্ষোভ এবং বিষয় তারা আশা করেছিলেন কম বয়সের কথা বিবেচনা করে প্রদ্যোতের শাস্তি কমানো হবে এবং ফাঁসির আদেশ রদ হবে কিন্তু তা হলো না । প্রদ্যোতের  বড়দা প্রভাতভূষণ ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ স্থগিত করার জন্য প্রিভি কাউন্সিলে আবেদন করলেন‌ সেই আবেদন অগ্রাহ্য হলো। ১৯ শে নভেম্বর পঙ্কজিনী দেবী তার পুত্রের প্রাণ রক্ষার জন্য ভিক্ষা চেয়ে আবেদন করলেন গভর্নরের কাছে। 19 ডিসেম্বর ভারত সম্রাট এর কাছে প্রদ্যোতের প্রাণ রক্ষার জন্য আবেদন করলেন। কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল। প্রদ্যোতের মৃত্যুদণ্ড বহাল রইল।                                    

                

               শেষের দিনগুলো

প্রদ্যোৎ প্রথম থেকেই জানতেন যে তার মায়ের আবেদন ব্যর্থ হবে। বস্তুত তিনি এটাই চাইতেন কারণ অন্তর থেকে চেয়েছিলেন, যে ইংরেজকে তিনি হত্যা করতে গিয়েছিলেন তারই কাছে ভিখারির মতো প্রাণভিক্ষার আবেদন কখনোই করবেন না। যাইহোক মায়ের আবেদন ব্যর্থ হওয়ায় প্রদ্যোত যেন মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তার অমৃত লোকের যাত্রাপথ সুগম হলো। দিনে দিনে প্রদ্যোতের ওজন বাড়তে লাগলো। 2.9.32 তারিখের আনন্দবাজারে উল্লেখ রয়েছে " তাহার শরীরের ওজন ১২৬ পাউন্ড হইয়াছে। স্বাস্থে শৌর্যে সৌন্দর্যে তিনি যেন আরো ভাস্বর হয়ে উঠলেন। "

এই সময় প্রদ্যোতের লেখা চিঠিপত্র গুলি পড়লে মনে হবে, মৃত্যুর জন্য প্রদ্যোতের কোন খেদ নেই। তিনি যেন আনন্দের সাগরে ভাসছেন।   আপন জননীর মধ্যে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন দেশমাতাকে। মাতা পংকজিনী দেবীকে তিনি লিখেছেন" মা তোমার প্রদ্যোত কখনো মরতে পারে? আজ চারিদিকে চেয়ে দেখো লক্ষ লক্ষ প্রদ্যোত তোমার দিকে চেয়ে হাসছে। আমি বেঁচেই রইলাম মা অক্ষয় অমর হয়ে। বন্দেমাতারম।" এই সময়ে প্রদ্যোতের সবচেয়ে  প্রিয় সঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ যা তাকে আত্মার শান্তি এনে দিয়েছিল। মৃত্যু পথযাত্রী প্রদ্যোতের মুখে চোখে দেহে ফুটে উঠেছিল এক আশ্চর্য লাবণ্য। তাই কারারক্ষীরাও তাঁকে প্রণাম করতো ।তার কাছে ধর্ম উপদেশ শুনতো। এমনকি কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে তার কয়েকটি চিঠি বাইরে চালানও করে দিয়েছিল। মৃত্যুর পূর্বে শেষবারের মতো মাতা পুত্রের সাক্ষাৎ হলো। গারদের ওপারে প্রদ্যোৎ এসে দাঁড়াতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন মাতা পঙ্কজিনী দেবী ।হাহাকার করে উঠলেন ,বললেন "এ তুই কি করলি বাবা"  হাসিমুখে সান্ত্বনা দিয়ে  প্রদ্যোত বললেন," তোমার আরও তিন ছেলে রইলো মা। তুমি কেঁদোনা। তাছাড়া দেশের আরো কত ছেলে তোমায় মা বলে ডাকবে। আজ যদি কলেরায় মৃত্যু হতো, তাহলে কেউ কি আমার নাম উচ্চারণ করত? আমার যাবার পর কত লোক তোমার কাছে আমার নাম করবে।"

প্রদ্যোতের আইনজীবী মন্মথনাথ দাস ও এই সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিভূত হয়েছিলেন। আর কয়েক দিনের মধ্যে যার ফাঁসি হবে তার মুখে কি অপূর্ব জ্যোতি! শরীরের কোথাও ভয়ের লেশ মাত্র নেই। প্রদ্যোত বলেছিলেন, এমন আনন্দ কখনো পাইনি। যত পড়ছি তত যেন আমার জীবনে সকল সমস্যা দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেন আনন্দ সাগরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছি।"

ফাঁসির আগের দিন অর্থাৎ ১৯৩৩ সাল ১১ই জানুয়ারি সকাল থেকেই জেলখানায় সাজ সাজ রথ চলেছে। ফাঁসির মঞ্চ ফাঁসির রজ্জু সব আবার দেখে নেওয়া হয়েছে। মাখানো হচ্ছে চর্বি ও তেল। সকাল থেকে প্রদ্যোত আবৃত্তি করছেন তার প্রিয় কবিতাগুলি। কারা কক্ষের ভিতর গমগম করছে তাঁর কণ্ঠস্বর। যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজনরা তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন প্রদ্যোত তাদের সান্তনা দিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বিকেল চারটায় সেলের বাইরে শেষবারের মতো দেখে নিলেন অস্তগামী সূর্যকে। পাশেই জেলবন্দি কৃষ্ণলাল তাকে ফিসফিস করে বললেন বড় ভাই কাউকে কিছু বলবার আছে কি বাক্য মাত্র উচ্চারণ করলেন আমার প্রতি রক্তবিন্দুতে যেন একটি করে শহীদ বের হয়।

১২ ই জানুয়ারি ১৯৩৩ সাল স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনেই বিপ্লবীদের ফাঁসি দিয়ে ইংরেজরা বিপ্লবীদের আতঙ্কিত করতে চায়। সেই দিনেই প্রদ্যোতের ফাঁসির দিন ঠিক হলো। সূর্য তখনও উঠেনি। পৌষের শেষ রাত কুয়াশায় আচ্ছন্ন। বাইরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে। প্রদ্যোৎ প্রতিদিনের মতো সেদিনও কিছুক্ষণ ব্যায়াম করলেন। তারপর গরম জলে ভালো করে স্নান করে পবিত্র হয়ে নিলেন তিনি। যে আজ স্বর্গপুরীতে গমন করবেন। এরপর কিছুক্ষণ একাগ্র চিত্তে গীতা পাঠ করলেন। জেলের ঘড়িতে ঢং ঢং করে সাড়ে পাঁচটা বাজল। জেলের সামনে একে একে গাড়ি থেকে নামলেন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ সুপার জেল সুপার প্রভৃতি। তারা এসে দেখলেন প্রদ্যোৎ স্নান সেরে পুজো সেরে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছেন।

কোন দিকে না তাকিয়ে নির্ভীক অকম্পিত পদক্ষেপে প্রদ্যোত এগিয়ে চলেছেন মঞ্চের দিকে এবং তারপর মঞ্চের উপরে উঠে দাঁড়ালেন। পেছনে প্রহরীরা ।পরবর্তী জেলা শাসক Mr Burge ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছেন তিনি প্রদ্যোতকে জিজ্ঞেস করলেন "Are you ready Pradyot?"

প্রদ্যোতের শান্ত চিত্তে বললেন one minute please ,Mr Burge . I have something to say. "তারপর বললেন "we are determined, Mr  Burge ,not to allow any European to remain at Midnapore .Yours is the next turn, get yourself ready.""অল্পক্ষণ থেমে আবার দৃঢ় কন্ঠে বললেন"I am not afraid of death. Each drop of my blood will give birth to hundreds of Pradyots in all houses of Bengal. Do your work please."

প্রদ্যোৎ স্তব্ধ হওয়ার পর জেলর মৃত্যুদণ্ড পাঠ করলেন। তারপর ফাঁসির রজ্জু গলায় পরানো হলো। প্রদ্যোতের মুখ ঢেকে দেওয়া হলো কালো কাপড়ে। সেই মুহূর্তে উচ্চকণ্ঠে প্রদ্যোত চিৎকার করে বললেন বন্দে মাতরম। ক্ষনিকের মধ্যেই তার পায়ের ফাঁসিকাঠ সরে গেল। উপরের রোজ্জুটি সামান্য ক্ষণ কেঁপে উঠে স্থির হল। মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

সারা কারাগার জুড়ে এবং কারাগারের বাইরে হাজার হাজার কন্ঠে মুহুরর্মুহু ধ্বনিত হচ্ছে বন্দেমাতরাম, শহিদ প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্য জিন্দাবাদ ।



       প্রদ্যোতের অন্তোষ্টিক্রিয়া

জীবিত প্রদ্যোতের ন্যায় মৃত প্রদ্যোতকেও ভয় পেয়েছিল ব্রিটিশ সিংহ। তাই বেয়নেটের ভয় দেখিয়ে, মিছিল নিষিদ্ধ করে, সৈন্য দিয়ে শহর ঘিরে ফেলে, লোকচক্ষুর আড়ালে প্রদ্যোতের অন্ত্যোষ্টি ক্রিয়া করা হয়েছিল জেলখানার বাইরে প্রাচীরের পশ্চিম দিকে জেল কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট করে দেওয়া একটি মুক্ত স্থানে। সেখানে শুধুমাত্র উপস্থিত ছিল প্রদ্যোতের   কয়েকজন আত্মীয়। এমনকি চিতাভস্ম সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়নি কাউকে। প্রদ্যোতকে হত্যা করা হলেও মানুষের মন থেকে তাকে মুছে ফেলার সাধ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছিল না। প্রদ্যোতের আত্মাহুতি মেদিনীপুরের বিপ্লবী যুবকদের মনে যে প্রতিশোধ স্পৃহা এবং উদ্দীপনা এনে দিয়েছিল তা পরবর্তী ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়। Nr. Burge কে উদ্দেশ্য করে রদ্ধতের ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল ঠিক পরের বছর বিপ্লবীরা এপ্রিল মাসে বিপ্লবীরা হত্যা করেছিল মিস্টার বার্জরকে‌। পরপর তিন জন বিদেশি জেলা শাসকের রক্ত সিক্ত হয়েছিল মেদিনীপুরের মাটি। বস্তুত মেদিনীপুরের ইউরোপিয়ানদের মনে তখন এপ্রিল মাস সম্বন্ধে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের মায়েরা শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ছড়া বলছেন-

"Sleep on sleep on baby

April is coming

B. V. Marching"

সত্য সত্যই প্রদ্যোতের আত্মাহুতি বাংলার ঘরে ঘরে সৃষ্টি করল শত শত প্রদ্যোত যারা পরাধীনতার শৃংখল মোচনের জন্য জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে এগিয়ে এসেছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা



Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 416

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা ।। উমাশঙ্কর নিয়োগী
Umasankar Neogi ।। উমাশংকর নিয়োগী

                                    অগ্নিযুগে বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রিয় বিচরণ ভূমি ছিল মেদিনীপুর জেলা। খ্যাত-অখ্যাত বহু বীর শহীদের জন্ম দিয়েছে  মেদিনীপুর। এই জেলা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। হঠাৎ করে মেদিনীপুর জেলার মানুষ দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী  হয়ে ওঠেনি-  এ তার উত্তরাধিকার সূত্রে…

Aug 10, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 140

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী শহীদ প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য ।। নিখিলেশ ঘোষ
Nikhilesh Ghosh ।। নিখিলেশ ঘোষ

"We are determined Mr burge not to allow any European to remain at Midnapore .yours is the next turn .Get yourself ready. I am not afraid of death .Each drop of my blood will give birth to hundreds of Pradyots…

Aug 5, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 203

স্বাধীনতা আন্দোলনে চেঁচুয়ার হাট ও মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ।। দুর্গাপদ ঘাঁটি
Durgapada Ghanti ।। দুর্গাপদ ঘাঁটি

দাসপুর থানার স্বাধীনতা আন্দোলন ও মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যেন অবিচ্ছেদ্য নাম ও সম্পর্ক। এমনই কিংবদন্তি যুগপুরুষের নাম দাসপুর তথা মেদিনীপুর জেলার স্বাধীনতা আন্দোলনেের ইতিহাসে ও আপামর মানুষের হৃদয় ফলকে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। এমন বিপ্লবী বীরের কথা আলোচনায় আনতে গেলে দাসপুরের…

Aug 5, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 120

কুখ্যাত ডগলাসের হত্যাকারী মহান বিপ্লবী প্রভাংশুশেখর পাল ।। নিখিলেশ ঘোষ
Nikhilesh Ghosh ।। নিখিলেশ ঘোষ

প্রদ্যোৎ কুমার ভট্টাচার্যের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু প্রভাংশুশেখর পাল ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা বিপ্লবী। জীবন মৃত্যুকে সত্যিই পায়ের ভৃত্য করে যিনি মাত্র ৪ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটকে গুলিবিদ্ধ করার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন। যেখানে ধরা পড়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু তা জেনেই তিনি অগ্রসর…

Aug 13, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 111

ঐতিহাসিক ফাঁসিডাঙা ।। পুলক রায়
Pulak Roy ।। পুলক রায়

  চন্দ্রকোণা শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে পিচঢালা রাস্তার পাশে বিশাল জমি একসময় বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। চারপাশে বট আর পাকুড়ের গাছ। এখানেই বড় বড় গাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি যেমন হাবল ,সুবল, রাজেন্দ্র, ফাগু, যুগল ও কিশোর সহ দেশভক্ত বহু…

Jul 31, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 97

স্বাধীনতা আন্দোলনে নাড়াজোল রাজপরিবার ।। দেবাশিস ভট্টাচার্য
Debasish Bhattacharjee ।। দেবাশিস ভট্টাচার্য

মেদিনীপুরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইংরেজ শাসন বিরোধী সাহসিকতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন নাড়াজোলের সীতারাম খান ও রানী শিরোমণী। কিন্তু ১৭৮৮ সালের পর ১৮৯৫ পর্যন্ত নাড়াজোলের জমিদাররা প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করেনি। কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন এতবড়ো জমিদারির সুরক্ষায় ইংরেজদের সঙ্গে সরাসরি শত্রুতামূলক…

Aug 13, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 165

স্বাধীনতা আন্দোলনে চন্দ্রকোণা : ১৯০৫-১৯৪২ খ্রী : ।। গণেশ দাস
Ganesh Das ।। গণেশ দাস

বণিকের 'মানদণ্ড', 'রাজদণ্ডে' রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকেই ইংরেজ শাসকের অনৈতিক শাসন, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে দিকে দিকে বাঙালি তথা ভারতবাসী গর্জে উঠেছিল। কখনো নিয়মতান্ত্রিক পথে, কখনো সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অবলম্বন করে বুঝিয়ে দিয়েছিল এ মাটি খুব শক্ত মাটি, স্বাধীন মাটি। এখানে…

Aug 13, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 445

স্বাধীনতা আন্দোলনে ঘাটাল মহকুমার জমিদার ও সামন্তদের ভূমিকা ।। দেবাশিস কুইল্যা
Debasish Kuila ।। দেবাশিস কুইল্যা

                আগস্ট মাস ভারতের স্বাধীনতার মাস। এই আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি একটা সময়ের মাপকাঠি। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ইতিহাস বর্ণে বর্ণে আন্দোলনের ধারাবাহিক ঘটনার স্থান, কাল ও ব্যক্তি বিশেষের উপর নির্ভর করে সংঘটিত হয়েছে। শুধু…

Aug 10, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 151

ঘাটাল মহকুমার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ।। অশোক পাল
Ashok Pal ।। অশোক পাল

অরবিন্দ মাইতি স্বাধীনতা সংগ্রামী অরবিন্দ মাইতির জন্ম দাসপুরের গোছাতি গ্রামে। তিনি ১৯২০ খ্রি. দাসপুর থানা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক হন। ১৯৩০ খ্রি. গান্ধীজীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে লবণ সত্যাগ্রহ ও মাদক দ্রব্য বয়কট আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মে মাসে লবণ তৈরী কেন্দ্র থেকে অরবিন্দ…

Aug 6, 2022
Card image




স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা   দেখেছেন : 129

লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে দাসপুরের শ্যামগঞ্জ ।। বঙ্কিম দে
Bankim Dey ।। বঙ্কিম দে

  নবাব মীরকাসিম ও ইংরেজ শাসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সন্ধির শর্ত হিসেবে পাশাপাশি দুটি চাকলা, চাকলা বর্ধমান ও চাকলা মেদিনীপুর কোম্পানির হস্তগত হয়। পরবর্তী চাকলা হিজলির তমলুক ও চেতুয়া পরগনার ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক সাদৃশ্য তে প্রচুর মিল ছিল। পরগনা গুলি নদী…

Aug 13, 2022
আরও পড়ুন
«
  • 1
  • 2
  • 3
»

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঘাটাল মহকুমা



মহুল ওয়েব প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যা



করোনা Diary



আমাদের কথা

আমাদের শরীরে লেপটে আছে আদিগন্ত কবিতা কলঙ্ক । অনেকটা প্রেমের মতো । কাঁপতে কাঁপতে একদিন সে প্রেরণা হয়ে যায়। রহস্যময় আমাদের অক্ষর ঐতিহ্য। নির্মাণেই তার মুক্তি। আত্মার স্বাদ...

কিছুই তো নয় ওহে, মাঝে মাঝে লালমাটি...মাঝে মাঝে নিয়নের আলো স্তম্ভিত করে রাখে আখরের আয়োজনগুলি । এদের যেকোনও নামে ডাকা যেতে পারে । আজ না হয় ডাকলে মহুল...মহুল...

ছাপা আর ওয়েবের মাঝে ক্লিক বসে আছে। আঙুলে ছোঁয়াও তুমি কবিতার ঘ্রাণ...

 

 

কবিতা, গল্প, কবিতা বিষয়ক গদ্য পাঠাতে পারেন ইউনিকোডে ওয়ার্ড বা টেক্সট ফর্মাটে মেল করুন [email protected] ।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- www.mohool.in এ প্রকাশিত লেখার বিষয়বস্তু ও মন্তব্যের ব্যাপারে সম্পাদক দায়ী নয় ।